সজনে বীজেই মিলতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সমাধান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪ বার
সজনে বীজেই মিলতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সমাধান

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান পানি দূষণের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রতিদিন আমরা যে পানি পান করছি, তার ভেতরেই অদৃশ্য ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এক নতুন গবেষণা আশার আলো দেখাচ্ছে, আর সেই আশার উৎস একটি খুবই পরিচিত গাছ—সজনে, যার বৈজ্ঞানিক নাম Moringa oleifera।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ জীবনে সজনে গাছ খুবই পরিচিত। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই গাছকে বহুদিন ধরেই ‘মিরাকল ট্রি’ বা অলৌকিক গাছ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে এবার এর এমন একটি গুণ সামনে এসেছে, যা শুধু পুষ্টি নয়, বরং বৈশ্বিক পরিবেশ সংকট মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ব্রাজিল ও যুক্তরাজ্যের একদল বিজ্ঞানীর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সজনে গাছের বীজ থেকে তৈরি নির্যাস পানির মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করতে অত্যন্ত কার্যকর।

এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ব্রাজিলের São Paulo State University-এর ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক Adriano Gonçalves dos Reis এবং তার সহকর্মীরা। তারা প্রায় এক দশক ধরে সজনে বীজের গুণাগুণ নিয়ে গবেষণা করছেন। বিশেষ করে এই বীজ কীভাবে ‘কোয়াগুল্যান্ট’ হিসেবে কাজ করে, তা নিয়েই তাদের দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান। কোয়াগুল্যান্ট এমন একটি উপাদান, যা পানির ক্ষুদ্র কণাগুলোকে একত্র করে বড় দানায় পরিণত করে, ফলে সেগুলো সহজেই ফিল্টার করে সরানো যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, সজনে বীজের নির্যাস পানিতে থাকা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলোকে একত্রিত করে বড় আকারে পরিণত করতে পারে। এর ফলে সেগুলোকে সহজেই ফিল্টার করে অপসারণ করা সম্ভব হয়। পরীক্ষায় প্রায় ১৮.৮ মাইক্রোমিটার আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়, যা মানুষের চুলের পুরুত্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ফলাফল ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক—এই পদ্ধতিতে প্রায় ৯৮.৫ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে সাধারণত ১ মাইক্রোমিটার বা তার কাছাকাছি আকারের ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাকে বোঝানো হয়। এই কণাগুলো এখন পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। সমুদ্রের গভীর তলদেশ থেকে শুরু করে পাহাড়ের চূড়ায়ও এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৮৩ শতাংশ কলের পানিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ক্ষুদ্র কণাগুলো ইতোমধ্যেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীরা মানুষের মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্র এবং প্রজনন অঙ্গেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। যদিও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে প্রাণীর ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, এটি হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট এবং প্রজনন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

গবেষণায় বিশেষভাবে পিভিসি বা Polyvinyl chloride ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ এটি অন্যতম ক্ষতিকর প্লাস্টিক এবং পানীয় পানিতে প্রায়ই পাওয়া যায়। গবেষকরা দেখেছেন, সজনে বীজ এই ধরনের প্লাস্টিক অপসারণেও অত্যন্ত কার্যকর।

বর্তমানে পানি পরিশোধনে বহুল ব্যবহৃত রাসায়নিক কোয়াগুল্যান্ট হলো অ্যালুমিনিয়াম সালফেট বা Aluminum sulfate, যা অ্যালাম নামে পরিচিত। কিন্তু এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অতিরিক্ত অ্যালুমিনিয়াম মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং এটি স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সেই তুলনায় সজনে বীজ একটি প্রাকৃতিক, নবায়নযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে সামনে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের University of New Mexico-এর হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের অধ্যাপক Matthew Campen, যিনি এই গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না, তিনি বলেন—প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে পানি পরিশোধন করা হলে তা শুধু সস্তাই হবে না, বরং পরিবেশের ওপর চাপও কমাবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এতে অ্যালুমিনিয়াম খননের প্রয়োজন কমে যাবে, যা পরিবেশের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তবে এই পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সজনে বীজ দিয়ে প্রায় ১০ লিটার পানি পরিশোধন করা সম্ভব। এটি ছোট পরিসরে কার্যকর হলেও বৃহৎ শহরের পানি পরিশোধন ব্যবস্থায় প্রয়োগ করতে হলে বিপুল পরিমাণ বীজের প্রয়োজন হবে। এছাড়া অতিরিক্ত বীজ ব্যবহারে পানিতে জৈব বর্জ্য তৈরি হতে পারে, যা আলাদাভাবে অপসারণ করতে হবে।

গবেষকরা বলছেন, এই প্রযুক্তি বিশেষ করে গ্রামীণ বা উন্নয়নশীল অঞ্চলে অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে, যেখানে আধুনিক রাসায়নিক বা প্রযুক্তিগত সুবিধা সহজলভ্য নয়। বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই সজনে গাছ সহজলভ্য হওয়ায় এটি একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে।

ভবিষ্যতে এই গবেষণাকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে সজনে বীজ অন্যান্য ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং আরও ক্ষুদ্র ন্যানোপ্লাস্টিক অপসারণে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। ন্যানোপ্লাস্টিক হলো আরও ক্ষুদ্র কণা, যা মানুষের শরীরে প্রবেশের ঝুঁকি আরও বেশি।

বিশ্বজুড়ে যখন প্লাস্টিক দূষণ একটি গুরুতর পরিবেশগত সংকটে পরিণত হয়েছে, তখন সজনে গাছের মতো সহজলভ্য ও প্রাকৃতিক উপাদান থেকে এমন সমাধান পাওয়া নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। এটি শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের একটি উদাহরণও বটে।

এই গবেষণা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরছে—আমরা কি প্রকৃতির সহজ সমাধানগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি? হয়তো ভবিষ্যতের টেকসই পৃথিবী গড়ার জন্য উত্তরটা লুকিয়ে আছে এমনই সাধারণ কিন্তু শক্তিশালী প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত