প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মহাবিশ্বের পরতে পরতে মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কত প্রতাপশালী রাজা বাদশাহ এই পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন কিন্তু সময়ের ব্যবধানে তারা সবাই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছেন। এই মহাজাগতিক নিয়মের বাইরে যাওয়ার সাধ্য কারো নেই। পবিত্র কোরআনের সুরা আম্বিয়ার ৩৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা এক চিরন্তন সত্যের ঘোষণা দিয়েছেন যা মানবজাতির জন্য এক বড় শিক্ষা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন যে আমি তোমার পূর্বেও কোনো মানুষকে স্থায়ী জীবন দান করিনি। সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি অনন্ত জীবন লাভ করবে? এই আয়াতে আল্লাহ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে মানুষের সীমাবদ্ধতা এবং পরকালের অবধারিত সত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন। মূলত মক্কার কাফের ও মুশরিকরা মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন ধরণের মন্তব্য করত। তারা মনে করত যে নবীজির তিরোধান হলে হয়তো তাদের জয় হবে। তাদের সেই অমূলক ধারণা ও কুযুক্তি খণ্ডন করতেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে মানুষের হায়াত বা জীবন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত।
তাফসিরে আহসানুল বায়ানে এই আয়াতের যে চমৎকার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তাতে স্পষ্ট হয় যে মৃত্যু কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয় বরং এটি মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি পরম বাস্তবতা। এই আয়াতের প্রেক্ষাপট ছিল মক্কার সেই সময়ের পরিস্থিতি যখন অবিশ্বাসী গোষ্ঠী নবীজির মৃত্যু কামনায় মত্ত ছিল। আল্লাহ তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু একজন মানুষ তাই মানুষ হিসেবে তিনিও এই পার্থিব নিয়ম থেকে মুক্ত নন। তবে প্রশ্ন জাগে যারা নবীজির মৃত্যু নিয়ে ব্যঙ্গ করছে তারা কি চিরকাল বেঁচে থাকবে? আল্লাহ এখানে কাফেরদের নির্বুদ্ধিতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। মানুষের স্বভাব হলো সে যখন সুস্থ থাকে বা ক্ষমতার শিখরে থাকে তখন সে নিজেকে অমর ভাবতে শুরু করে। কিন্তু আল্লাহ এই আয়াতের মাধ্যমে অহংকারী মানুষকে বিনয়ী হওয়ার ডাক দিয়েছেন। এই আয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি ভ্রান্ত আকিদাকে সংশোধন করে দেয়। অনেক সময় দেখা যায় মানুষ বিভিন্ন আম্বিয়া বা আউলিয়াগণের চিরজীবী থাকার ধারণা পোষণ করে থাকে কিন্তু আল্লাহর এই বাণী সেই ধারণার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। কারণ সৃষ্টির কোনো মানুষই চিরস্থায়ী নয়।
প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার ইবনে তাইমিয়্যাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহিসহ অনেক মুফাসসির এই আয়াতের ভিত্তিতেই মত পোষণ করেছেন যে খিজির আলাইহিস সালামও ইন্তেকাল করেছেন। কারণ আল্লাহ যেহেতু পবিত্র কোরআনে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে তিনি কোনো মানুষকে চিরস্থায়ী করেননি তাই খিজির আলাইহিস সালাম মানুষ হিসেবে সেই অমোঘ নিয়মের আওতাভুক্ত। ইসলামের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো এই নশ্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে আখিরাতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। মানুষের জীবন নদীর স্রোতের মতো যা ক্রমশ সমুদ্রের মোহনার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এখানে কেউ আগে যাবে আর কেউ পরে কিন্তু গন্তব্য সবারই এক। পৃথিবীর কোনো সম্পদ বা প্রতিপত্তি মৃত্যুকে আটকাতে পারে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবন আমাদের জন্য বড় উদাহরণ। তিনি আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা ও শ্রেষ্ঠ রাসূল হওয়া সত্ত্বেও তাকে এই পৃথিবী বিদায় জানাতে হয়েছে। যদি সৃষ্টির সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিত্বের মৃত্যু অনিবার্য হয় তবে সাধারণ মানুষের অহংকার করার কোনো অবকাশই থাকে না।
সুরা আম্বিয়ার এই আয়াত থেকে আমরা বড় ধরণের কিছু জীবনবোধ অর্জন করতে পারি। প্রথমত দুনিয়া আমাদের জন্য কোনো স্থায়ী নিবাস নয় বরং এটি একটি পরীক্ষাগার। এখানে আমরা কতদিন থাকলাম তার চেয়ে বড় বিষয় হলো আমরা কতটুকু ভালো কাজ নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারছি। অবিশ্বাসী বা কাফিররা মনে করত যে মৃত্যু মানেই সব শেষ হয়ে যাওয়া কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায় মৃত্যু হলো এক নতুন ও অনন্ত জীবনের প্রবেশদ্বার। কাফিররা ভাবত নবীজি মারা গেলে হয়তো তাদের মতবাদই সঠিক প্রমাণিত হবে কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী যে রাসূলের ইন্তেকালের পর ইসলামের প্রচার ও প্রসার বিশ্বব্যাপী আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটিই আল্লাহর কুদরত যা মানুষের সীমিত জ্ঞানে সবসময় ধরা পড়ে না। দ্বিতীয়ত এই আয়াত আমাদের শেখায় যে কোনো মানুষের ওপর নির্ভর না করে কেবল আল্লাহর ওপরই ভরসা রাখা উচিত। কারণ মানুষ নশ্বর কিন্তু আল্লাহ অবিনশ্বর। যারা নিজেদের পীর বা নেতাদের অতিমানবীয় মনে করে তাদের জন্য এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত প্রখর।
বর্তমান এই অস্থির সময়ে মানুষ যখন পার্থিব উন্নতির পেছনে অন্ধ হয়ে ছুটছে তখন এই ধরণের ঐশী বাণী আমাদের আত্মাকে প্রশান্তি দেয় এবং সঠিক পথের দিশা দেখায়। আমরা প্রতিদিন খবরের কাগজে মৃত্যুর সংবাদ দেখি কিন্তু আমরা নিজেরা যে একদিন সেই সংবাদের শিরোনাম হব তা ভুলে যাই। সুরা আম্বিয়ার এই আয়াত আমাদের সেই বিস্মৃত চেতনার দুয়ারে কড়া নাড়ে। দুনিয়ার মোহ আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে বলেই আমরা মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে অবহেলা করি। অথচ মৃত্যু যেকোনো মুহূর্তে আমাদের দরজায় কড়া নাড়তে পারে। তাই বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং পরকালের পাথেয় সংগ্রহে সচেষ্ট হয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই আয়াতের গূঢ় রহস্য অনুধাবন করার এবং পরকালের কঠিন মুহূর্তগুলোর জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার তৌফিক দান করুন। পরিশেষে বলা যায় মৃত্যু কেবল একটি বিচ্ছেদ নয় বরং এটি মুমিনের জন্য তার মাওলার সাথে সাক্ষাতের একটি মাধ্যম। যদি আমাদের জীবন আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত হয় তবে মৃত্যু কোনো ভীতিকর বিষয় নয় বরং এটি অনন্ত সুখের ঠিকানায় পৌঁছানোর সেতু মাত্র।