প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বলিউড তারকাদের নিয়ে ভক্তদের আগ্রহের শেষ নেই। তাদের অভিনয়, ব্যক্তিজীবন, ব্যবহার কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুই যেন দর্শকদের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমন কিছু ঘটনা সামনে আসে, যা শুধু একজন অভিনেতার জনপ্রিয়তাই নয়, তার মানবিক দিকটিকেও নতুনভাবে তুলে ধরে। সম্প্রতি বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খানকে ঘিরে তেমনই একটি পুরোনো ঘটনার কথা প্রকাশ্যে এনেছেন প্রযোজক কেসি বোকাদিয়া। প্রায় দুই দশক আগের সেই স্মৃতি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ভারতীয় গণমাধ্যমে।
২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাম তুমহারে হ্যায় সনম’ সিনেমাকে ঘিরে। বহু প্রতীক্ষিত এই সিনেমায় একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন শাহরুখ খান, সালমান খান এবং মাধুরী দীক্ষিতের মতো জনপ্রিয় তারকারা। মুক্তির আগে সিনেমাটি ঘিরে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কারণ তখনকার সময় বলিউডে একসঙ্গে এত বড় তারকাদের উপস্থিতি ছিল বিরল ঘটনা। ধারণা করা হয়েছিল, সিনেমাটি বক্স অফিসে বড় ধরনের সাফল্য পাবে। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা করতে পারেনি সিনেমাটি। আর সেই ব্যর্থতার চাপ গিয়ে পড়ে প্রযোজকের ওপর।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রযোজক কেসি বোকাদিয়া জানান, সিনেমাটির জন্য শাহরুখ খান প্রায় ৯৫ লাখ রুপি পারিশ্রমিক চেয়েছিলেন। সেই সময়ের হিসেবে এটি ছিল বিশাল অঙ্কের অর্থ। তবে সিনেমা মুক্তির পর ব্যবসায়িকভাবে আশানুরূপ ফল না আসায় তিনি আর্থিক সংকটে পড়ে যান। প্রযোজক হিসেবে তার ওপর দেনার চাপও তৈরি হয়েছিল। এমন অবস্থায় শাহরুখ খানের বাকি পারিশ্রমিক পরিশোধ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
কেসি বোকাদিয়ার ভাষ্যমতে, তিনি যখন শাহরুখের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন, তখন অভিনেতা এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন যা তাকে শুধু বড় তারকা নয়, বড় মনের মানুষ হিসেবেও আলাদা পরিচিতি দেয়। শাহরুখ নাকি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, তিনি সেই টাকা আর নেবেন না। কারণ তার মতে, একজন প্রযোজকের আর্থিক ক্ষতির সময় বাড়তি চাপ তৈরি করা ঠিক হবে না। এমনকি তিনি নাকি মজা করেই বলেছিলেন, এই টাকা তিনি অন্য জায়গা থেকেও আয় করতে পারবেন, কিন্তু প্রযোজককে তা দিতে গেলে হয়তো নিজের বাড়ি বিক্রি করতে হতে পারে।
এই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কেসি বোকাদিয়া। তিনি জানান, একাধিকবার চেষ্টা করেও শাহরুখকে টাকা দিতে পারেননি। অভিনেতা প্রতিবারই সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। বলিউডের মতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ ইন্ডাস্ট্রিতে যেখানে পারিশ্রমিক, লাভ-লোকসান এবং ব্যবসায়িক হিসাবই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে শাহরুখের এমন আচরণ অনেকের কাছেই বিরল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বলিউড বিশ্লেষকদের মতে, শাহরুখ খানের জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু তার অভিনয় দক্ষতাই নয়, ব্যক্তিত্ব এবং সহকর্মীদের প্রতি আচরণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বহুবার তিনি সহশিল্পী, প্রযোজক কিংবা ইউনিট সদস্যদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। বিভিন্ন সময় শুটিং ইউনিটের কর্মীদের প্রতি তার আন্তরিকতা কিংবা নতুন শিল্পীদের উৎসাহ দেওয়ার ঘটনাও সংবাদ শিরোনাম হয়েছে।
‘হাম তুমহারে হ্যায় সনম’ সিনেমাটি নির্মাণেও ছিল নানা জটিলতা। দীর্ঘ সময় ধরে নির্মাণকাজ চলেছিল এই সিনেমার। মাঝখানে শুটিং বন্ধও ছিল কয়েকবার। তবুও বড় তারকাদের উপস্থিতির কারণে দর্শকদের আগ্রহ কমেনি। সিনেমাটি মুক্তির পর গান ও কিছু দৃশ্য জনপ্রিয় হলেও সার্বিকভাবে প্রত্যাশিত ব্যবসা করতে পারেনি। তবে এত বছর পরও সিনেমাটি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হয়ে রয়েছে এর তারকাবহুল কাস্ট এবং নির্মাণ-পরবর্তী নানা অজানা গল্প।
শাহরুখ খানের ক্যারিয়ারে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, বরং বলিউডের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত। নিজের সংগ্রামের গল্প, শূন্য থেকে উঠে এসে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানো এবং ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার লড়াই তাকে সাধারণ মানুষের কাছেও অনুপ্রেরণার প্রতীক করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তারকারা যখন কোনো প্রযোজকের কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ান, তখন সেটি পুরো ইন্ডাস্ট্রির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। কারণ চলচ্চিত্র শুধু শিল্প নয়, এটি বড় একটি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রও। একটি সিনেমা ব্যর্থ হলে শুধু প্রযোজক নয়, এর সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েন। সেই জায়গা থেকে শাহরুখের সিদ্ধান্তকে অনেকেই মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ হিসেবে দেখছেন।
বর্তমান সময়ের বলিউডে কোটি কোটি রুপির বাজেটে সিনেমা নির্মাণ হয়। তারকাদের পারিশ্রমিকও আকাশছোঁয়া। ফলে একটি সিনেমা ব্যর্থ হলে প্রযোজকদের ওপর আর্থিক চাপ অনেক বেড়ে যায়। এ অবস্থায় পুরোনো দিনের এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, সম্পর্ক ও মানবিকতার মূল্য কখনো শুধুমাত্র অর্থ দিয়ে বিচার করা যায় না।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শাহরুখ খানের এই পুরোনো ঘটনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক ভক্তই বলছেন, এ কারণেই শাহরুখ শুধু একজন অভিনেতা নন, বরং কোটি মানুষের হৃদয়ের ‘বাদশাহ’। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, পর্দার বাইরেও তার আচরণ তাকে প্রকৃত অর্থেই বড় তারকায় পরিণত করেছে।
চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একজন তারকার জনপ্রিয়তা কমতে বা বাড়তে পারে, কিন্তু মানুষের প্রতি আচরণ ও মানবিকতা তাকে দীর্ঘ সময় স্মরণীয় করে রাখে। শাহরুখ খানের এই সিদ্ধান্ত সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ হয়ে রইল।
দুই দশক আগের সেই ঘটনার পুনরুত্থান যেন আবারও মনে করিয়ে দিল, সিনেমা কেবল আলো-ঝলমলে পর্দার গল্প নয়; এর আড়ালেও থাকে সম্পর্ক, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতার অসংখ্য অনুচ্চারিত গল্প। আর সেই গল্পগুলোর মধ্যেই একজন তারকার প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে সবচেয়ে বেশি।