প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেটে নিবন্ধনবিহীন অনলাইন নিউজ পোর্টাল অপসারণে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের মুখে শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি)। অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল বন্ধের নির্দেশনা জারি করার ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই পূর্বের গণবিজ্ঞপ্তি বাতিল করে নতুন বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে এসএমপি। এই ঘটনাকে ঘিরে সাংবাদিক মহল, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বিষয়টিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা এবং ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন।
ঘটনার সূত্রপাত বুধবার (২৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায়। ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর স্বাক্ষরিত একটি গণবিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ২০১৭ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী অনলাইন নিউজ পোর্টাল পরিচালনার জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। কিন্তু কিছু অনলাইন পোর্টাল যথাযথ নিবন্ধন ছাড়াই সংবাদ প্রকাশ করছে এবং এর মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহানিকর তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। এমনকি সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার অভিযোগও তোলা হয় ওই বিজ্ঞপ্তিতে।

এসএমপির বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, গণবিজ্ঞপ্তি জারির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রেজিস্ট্রেশনবিহীন অনলাইন নিউজ পোর্টাল দেশি ও বিদেশি ডোমেইন থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। অন্যথায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি এসব অনলাইন পোর্টালের কোনো সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার, লাইক বা মন্তব্য করা থেকেও নাগরিকদের বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়।
এই ঘোষণার পরপরই তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সাংবাদিক সংগঠন, গণমাধ্যম বিশ্লেষক এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন—কোন আইনি ক্ষমতাবলে একটি মহানগর পুলিশ ইউনিট অনলাইন পোর্টাল অপসারণের নির্দেশ দিতে পারে? অনেকেই এটিকে ‘তুঘলকি সিদ্ধান্ত’ হিসেবে আখ্যা দেন। বিশেষ করে ‘দেশি-বিদেশি ডোমেইন থেকে অপসারণ’ সংক্রান্ত বক্তব্যটি নিয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও প্রশ্ন তোলেন। তাদের মতে, কোনো ওয়েবসাইট বা ডোমেইন অপসারণের বিষয়টি প্রযুক্তিগত ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার সঙ্গে জড়িত, যা একটি আঞ্চলিক পুলিশ ইউনিটের সরাসরি এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সাংবাদিক ও নাগরিক অধিকারকর্মীদের অনেকে মন্তব্য করেন, এই ধরনের নির্দেশনা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে এমন সময়ে এই নির্দেশনা আসে, যখন সরকার আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরছে।
ফেসবুকে নিজাম উদ্দিন টিপু নামে একজনের দীর্ঘ পোস্ট বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। তিনি লেখেন, একই দিনে দুই ধরনের বার্তা এসেছে। একদিকে ঢাকায় সরকার সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে সিলেটে মহানগর পুলিশ এমন নির্দেশনা জারি করছে যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার এই মন্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই সেটি শেয়ার করেন।
তীব্র সমালোচনার মুখে বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সকালে নতুন গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এসএমপি। এতে আগের নির্দেশনা বাতিল করা হয়েছে বলে জানানো হয়। নতুন বিজ্ঞপ্তিতেও পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর স্বাক্ষর ছিল। তবে কেন আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হলো বা কোন পরিস্থিতিতে এমন পরিবর্তন আনা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। শুধু পূর্বের বিজ্ঞপ্তির স্মারক নম্বর উল্লেখ করে সেটি বাতিল ঘোষণা করা হয়।
এ ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের অনলাইন গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা ও নীতিমালা বাস্তবায়নের প্রশ্ন। তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিপুল সংখ্যক অনলাইন নিউজ পোর্টাল পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে অনেকেরই নিবন্ধন নেই। সরকার কয়েক বছর ধরেই অনলাইন গণমাধ্যমকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে অনলাইন গণমাধ্যমের দ্রুত বিস্তার, প্রযুক্তিগত বাস্তবতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিষয়টি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুয়া খবর, অপপ্রচার এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অবশ্যই আইনসম্মত, স্বচ্ছ এবং গণতান্ত্রিক হতে হবে। কোনো নির্দেশনা যদি সাংবাদিকতা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে তা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করবেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সংবিধান, তথ্যপ্রযুক্তি আইন, প্রেস কাউন্সিল নীতিমালা এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধিবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত অবস্থান প্রয়োজন। তারা মনে করেন, প্রশাসনিক পর্যায়ে হঠাৎ এমন নির্দেশনা জারি হলে তা শুধু বিতর্কই বাড়ায় না, বরং সরকারের সামগ্রিক অবস্থান নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি করে।
অন্যদিকে, সাংবাদিকদের একাংশ বলছেন, অনলাইন গণমাধ্যমের ক্ষেত্রটি এখন বাংলাদেশের সংবাদ পরিবেশের একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক সংবাদই এখন মূলধারার মিডিয়ার আগে অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নিবন্ধনের প্রশ্ন থাকলেও এসব প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের এই নির্দেশনা ও পরবর্তী সময়ে তা প্রত্যাহারের ঘটনা দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আর এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি এখন শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং তা নাগরিক অধিকার, প্রযুক্তি ও গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।