প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি অবস্থানকে ঘিরে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রশাসনের সম্ভাব্য নৌ-অবরোধ জোরদারের পরিকল্পনার খবর প্রকাশ্যে আসার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক মহল থেকে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ আরও কঠোর করে, তাহলে ইরানও তার জবাব দেবে। এই বক্তব্যকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনির জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই বলেন, মার্কিনিদের অবরোধ আর সহ্য করা হবে না। তার ভাষায়, “অবরোধ যদি অব্যাহত থাকে, ইরান জবাব দেবে।” তিনি আরও বলেন, অতীতেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও নৌ অবরোধ আরোপ করেছিল, কিন্তু সেসব ব্যবস্থা কার্যকরভাবে ইরানকে থামাতে পারেনি।
মোহসেন রেজাইয়ের বক্তব্যে ছিল আত্মবিশ্বাসের সুর। তিনি বলেন, ভারত মহাসাগর অত্যন্ত বিস্তৃত এলাকা এবং ইরান ইতোমধ্যেই বিভিন্ন সময় সেই পথ ব্যবহার করে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে অবরোধ কার্যকর করার চেষ্টা করছে, বাস্তবে তা পুরোপুরি সম্ভব নয়। এই বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা শুধু কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন না, বরং এটিকে সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনার ইঙ্গিত হিসেবেও বিবেচনা করছেন।
গত ছয় সপ্তাহে মোজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে না দেখা যাওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে। কেউ কেউ দাবি করেন, তিনি নিরাপত্তাজনিত কারণে আত্মগোপনে আছেন। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অসুস্থতা বা নিহত হওয়ার গুজবও ছড়িয়ে পড়ে। এসব গুঞ্জনের জবাব দিতেই মূলত সামনে আসেন মোহসেন রেজাই। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “সুপ্রিম লিডার তরুণ, স্বাস্থ্যবান এবং তেজোময়। তিনি দেশের সবকিছু দেখছেন।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান সরকার জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলকে একটি বার্তা দিতে চেয়েছে যে, দেশটির নেতৃত্বে কোনো সংকট নেই।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও দিন দিন আরও কঠোর হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যেই ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়ানোর নানা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্য, জ্বালানি রপ্তানি এবং আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতা সীমিত করতে নতুন নৌ-অবরোধের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। গত সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন তথ্য রয়েছে যা অনুযায়ী মোজতবা খামেনি জীবিত আছেন এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সক্রিয় রয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই নতুন উত্তেজনা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি এবং ভারত মহাসাগর ঘিরে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবহন এই অঞ্চলের সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সামান্য সংঘাতও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের বর্তমান অবস্থান মূলত শক্ত অবস্থান প্রদর্শনের কৌশল। নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর দেশটির সরকার জনগণের সামনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক সক্ষমতা তুলে ধরতে চাইছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে। ফলে দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি বার্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তবে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন, উভয় পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে রাজনৈতিক কৌশলও রয়েছে। কারণ সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া ইরান কিংবা যুক্তরাষ্ট্র—কোনো পক্ষের জন্যই সহজ সিদ্ধান্ত হবে না। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই উভয় পক্ষকে এগোতে হবে।
ইরানের অভ্যন্তরেও এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরোধ, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয়তাবাদী অবস্থান ও বহিরাগত হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বার্তা জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব বুঝতে পারছে যে, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে জনগণের মধ্যে ঐক্যের বার্তা দেওয়া জরুরি। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে তারা জনগণের মধ্যে প্রতিরোধের মনোভাব তৈরি করতে চাইছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও অস্থির সময়ের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নৌ-অবরোধ, ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি এবং নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন বিশ্বের নজর ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও এই অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর।