প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের শেয়ারবাজারে অতীতের মতো অনিয়ম বা লুটপাটের সুযোগ আর থাকবে না বলে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বাজার ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে কেউ আর পুঁজিবাজারে অপব্যবহারের সুযোগ পাবে না।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩ সংশোধন সংক্রান্ত বিল নিয়ে আলোচনার সময় অর্থমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, অতীতের যেকোনো সরকারের সময় শেয়ারবাজারে অনিয়ম হয়েছে এমন ধারণা ভুলভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে, বাস্তবে কোনো সরকারের আমলেই ইচ্ছাকৃতভাবে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করা হয়নি। বর্তমান সরকারও বাজারকে স্থিতিশীল ও আস্থার জায়গায় রাখতে কাজ করছে।
সংসদে অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬ নিয়ে বিশেষ কমিটির সুপারিশ বিবেচনা করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে আর দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন নেই বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, অর্থনৈতিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।
অধিবেশনে বিলটি নিয়ে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি শেয়ারবাজারে অতীতের অনিয়ম, বিশেষ করে ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালের বড় ধরনের ধসের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, দেশের পুঁজিবাজার বারবার আস্থার সংকটে পড়েছে। তার দাবি, গত দেড় দশকে শেয়ারবাজার থেকে এক লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ অপচয় বা লুট হয়েছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়েছে।
রুমিন ফারহানা বলেন, পুঁজিবাজার একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলেও বাংলাদেশে এটি বহুবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। তার মতে, যারা এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা উচিত। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে দক্ষ ও যোগ্য জনবল নিয়োগের মাধ্যমে বাজারকে পুনরায় আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান।
তার বক্তব্যের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো একটি স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার গড়ে তোলা। তিনি দাবি করেন, বর্তমান কমিশন ও নীতিনির্ধারকরা বাজারকে নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার পথে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে এখন থেকে রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে যোগ্যতা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে আর কোনো নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনায় না হয়।
সংসদে বিরোধী দলের নেতারা শেয়ারবাজার সংস্কার ও আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তাদের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, বরং বাস্তব প্রয়োগ এবং শক্তিশালী জবাবদিহি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
আলোচনার এক পর্যায়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। তিনি আশ্বস্ত করেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কঠোর নজরদারি বজায় থাকবে।
এদিকে সংসদে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সংশোধন বিল-২০২৬ কণ্ঠভোটে পাস হয়। যদিও বিরোধী দল এ বিলের কিছু ধারার বিরোধিতা করে এবং পুনরায় আলোচনার দাবি জানায়, তবে তা গৃহীত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে শেয়ারবাজার নিয়ে এই আলোচনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল রাখতে নীতিগত ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে শেয়ারবাজারে অতীতের অনিয়ম ও ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং বিরোধী দলের উদ্বেগ—দুই দিক মিলিয়ে দেশের পুঁজিবাজার সংস্কার নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।