এক বছরের আয়নায় জুলাই অভ্যুত্থান—বদলে যাওয়া না বদলে ফেরা?এক বছরে বৈষম্য কতটা দূর হলো?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ আগস্ট, ২০২৫
  • ৬০ বার

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’—এই স্লোগানে এক বছর আগে শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন, যা দেখতে দেখতে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের স্লোগানে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে। গত ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার দীর্ঘ সাড়ে পনেরো বছরের শাসনের অবসান ঘটে, শপথ নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ছাত্র নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত নতুন প্রশাসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পুরনো বৈষম্যভিত্তিক কাঠামোর মূলোৎপাটনের। কিন্তু বছর ঘুরে এসে প্রশ্ন জাগছে—কতটা পেরেছে তারা সেই বৈষম্য দূর করতে?

আশা ছিল, গণতান্ত্রিক চেতনায় উজ্জীবিত এক প্রশাসনিক রূপান্তর আসবে; বাস্তবে পাওয়া গেছে পুরনোরই পুনরাবৃত্তি। আজকের বাংলাদেশে চলছে এক অদ্ভুত প্যারাডক্স—নতুন মুখের পুরনো আদব-কায়দা। প্রশাসনিক কাঠামোতে তেমন কোনো আমূল পরিবর্তনের প্রমাণ মেলেনি, বরং পুরনো ‘স্যার’ কালচার, প্রটোকল সংস্কৃতি, এবং ক্ষমতার অপব্যবহারই যেন রয়ে গেছে আগের মতোই।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন স্তরে যারা আছেন, তারা অনেকেই পূর্ববর্তী প্রশাসনিক সংস্কৃতিরই উত্তরসূরি। অতীতে যারা বৈষম্যবিরোধী স্লোগান তুলে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন, আজ তাদেরই কেউ কেউ ক্ষমতার বলয়ে থেকে অভিযোগের মুখে পড়েছেন। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন না আসার পেছনে ব্যর্থ রাজনীতিক প্রজ্ঞা, অদক্ষতা এবং সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করছেন তারা।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণের কয়েকদিনের মধ্যেই রাজধানীর এক সাধারণ যানজটে আটকা পড়ে জনগণের সহানুভূতি অর্জন করলেও, সেই প্রতীকী চিত্র বাস্তবে কোনো নীতিগত পরিবর্তনে রূপ নেয়নি। আজও রাজধানীর প্রতিটি মোড়ে ভিআইপি প্রটোকলের নামে থমকে থাকে জনজীবন, আর সরকারি অফিসে সাধারণ নাগরিকরা নানা হয়রানির শিকার হন আগের মতোই। বিআরটিএ-তে সাত লাখের বেশি ড্রাইভিং লাইসেন্স আটকে থাকার খবর বা পাসপোর্ট অফিসে পুরনো দুর্ভোগের দৃশ্য যেন বদল হয়নি একচুলও।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহা মির্জা মনে করেন, ‘নিপীড়নমূলক আমলাতন্ত্রের মধ্যেই যারা ছিল, তারাই তো এখনও বহাল তবিয়তে। ফলে প্রশাসনিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কোনো যুগান্তকারী পরিবর্তন হয়নি’। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানি অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌসও বলেন, ‘নতুন সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে, ফলে ব্যবস্থাপনার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল দুর্বল’। এমনকি তিনি এটাও বলেন যে, দলীয়করণ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির যে জঞ্জাল বহুকাল ধরে জমে আছে, তা এক বছরে পরিষ্কার হবে এমন প্রত্যাশা অবাস্তব।

পরিবর্তনের অভাব শুধু প্রশাসনিক নয়, আন্দোলনের অন্দরমহলেও দেখা দিয়েছে বিপরীতমুখী চিত্র। যেসব তরুণ নেতৃত্ব দিয়েছেন এই অভ্যুত্থানে, তাদের কেউ কেউ অভিযুক্ত হয়েছেন চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির মতো গুরুতর অভিযোগে। গুলশানে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে ধরা পড়া আবদুর রাজ্জাক বিন সোলাইমান কিংবা সরকারি খরচে বিতর্কিত বিভাগীয় সফরের অভিযোগে বিদ্ধ হওয়া সাবেক ছাত্রনেতাদের কাহিনী এখন নিয়মিত সামাজিক মাধ্যম আর সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে।

জুলাই আন্দোলনের প্রাক্তন মুখপাত্র উমামা ফাতেমা নিজেই অভিযোগ করেছেন যে আন্দোলনকে ‘মানিমেকিং মেশিনে’ পরিণত করা হয়েছে। আরেক সহ-সমন্বয়ক হাসিবুর ইসলাম নাসিফ অভিযোগ করেন, অভ্যুত্থানের পর আন্দোলন নিজের ভেতরেই কোটা সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল—ভাই, বন্ধু, সিনিয়র, জুনিয়র ইত্যাদি সম্পর্কের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আবার বৈষম্যই চর্চা করা হয়েছে।

নারীর প্রতি বৈষম্যের ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ থাকছে। রোকেয়া হল থেকে মধ্যরাতে বেরিয়ে এসে যারা স্লোগান দিয়েছিলেন নারী অধিকার নিয়ে, তাদের প্রত্যাশা ছিল অন্তত এই এক বছরে নারী নিরাপত্তা ও সম্মানের বিষয়ে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, হেনস্তাকারীদের সামাজিকভাবে পুনর্বাসনের সংস্কৃতি আরও বেশি মাত্রায় বিদ্যমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান ইমুর ভাষায়, ‘জুলাই এখন বাঁচার আন্দোলন থেকে বেচার আন্দোলনে পরিণত হয়েছে’।

অধিকারের বৈষম্য না কমে বরং আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে বলেই মনে করেন আন্দোলনের আরেক নেতৃত্ব মাইশা মালিহা। তার মতে, ‘সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের ভেতর সংস্কার তো আসেইনি, বরং অপরাধীদের পুরস্কৃত করার সংস্কৃতি এখন বেশি চোখে পড়ছে’।

অন্যদিকে এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের পারিবারিক দুর্নীতির অভিযোগ হোক কিংবা পাঠ্যবই ছাপার কাগজে কমিশন বাণিজ্য নিয়ে গাজী সালাউদ্দিন তানভীরের বিতর্ক, কিংবা নিজ জেলায় গাড়িবহরের মিছিল করে আলোচনায় আসা সারজিস আলম—সবখানেই রয়েছে জনরোষের ছায়া। এসব ঘটনা প্রমাণ করছে যে, প্রশাসনিক পরিবর্তন যতটা কাঠামোগত, ততটাই মনস্তাত্ত্বিক—আর তা বাস্তবে ঘটেনি বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

এই এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার এবং নতুন ছাত্র নেতৃত্ব যেটুকু আশা জাগিয়ে তুলেছিল, তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। বরং পুরনো ব্যবস্থার মধ্যেই যেন সবাই নতুন করে খাপ খাইয়ে নিয়েছে নিজেদের। ‘বহু বছরের জঞ্জাল, এক বছরে পরিষ্কার হয় না’—এ কথার সত্যতা আছে বৈকি, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—চেষ্টাটুকু কি করা হয়েছে?

দেশের সাধারণ মানুষ, যারা একদিন ‘ভোর হবে’ ভেবে পথে নেমেছিল, তারা আজও দিনশেষে একটি কথাই বলেন—‘শুধু মুখ বদলেছে, বৈষম্যের শরীর রয়ে গেছে আগের মতোই’। তাদের জন্য এই বছরটি যেন প্রতিশ্রুতির ছলনায় আবদ্ধ এক নীরব প্রত্যাখ্যান। সত্যি কি তবে আগামী আগস্টেও লিখতে হবে—‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই এখনও আছে’?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত