প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গণঅভ্যুত্থানের ঠিক আগমুহূর্তে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠজন এবং তৎকালীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস সম্প্রতি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ফোনালাপের সূত্র ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও জনমত। ফোনালাপটি অভ্যুত্থানের কয়েকদিন আগে হাসিনা ও তাপসের মধ্যে সংঘটিত বলে দাবি করা হয়েছে, যা তৎকালীন ক্ষমতাসীন মহলের অভ্যন্তরীণ টালমাটাল পরিস্থিতি এবং দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার আয়োজনের ইঙ্গিত দেয়।
ফোনালাপটি প্রথম প্রকাশ করেন প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের, যিনি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে সোমবার রাতে দুটি পৃথক অডিও অংশ পোস্ট করেন। এর একটি তারিখ অনুযায়ী গত বছরের ২২ জুলাই এবং অপরটি ৩ আগস্ট ২০২৪ সালের বলে দাবি করা হয়েছে। সায়েরের দাবি অনুযায়ী, দ্বিতীয় অডিওর সময়টি এমন এক মুহূর্তে, যখন গণআন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিতে চলেছে এবং সরকার পতনের আভাস অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রথম অডিওতে শোনা যায়, তাপস শেখ হাসিনাকে ‘হাসুমনি’ সম্বোধন করে আবদার করছেন—“একটু আসতে চাচ্ছিলাম, তোমাকে দেখতে চাচ্ছিলাম, আসব?” হাসিনা উত্তরে পরিস্থিতির উত্তেজনার কথা জানিয়ে বলেন, “এসবের মধ্যে আসার দরকার নেই।” আলোচনার একপর্যায়ে তাপস আবার বলেন, “তাহলে (কারফিউ) শিথিল হওয়ার পর আসি?” শেখ হাসিনা জানান, তিনি তখন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে থাকবেন এবং পরামর্শ দেন তাপস যেন অফিসে গিয়ে দেখা করে।
তবে বেশি আলোড়ন তুলেছে দ্বিতীয় অডিওটি, যেখানে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়—তাপস বিদেশ পালানোর চেষ্টা করছেন এবং সেই প্রয়াসে শেখ হাসিনার সরাসরি সহায়তা কামনা করছেন। অডিওতে তাপস শেখ হাসিনাকে বলেন, “আমি একটু সিংগাপুর যেতে চাচ্ছিলাম, যাব?” উত্তরে হাসিনা তাকে যেতে অনুমতি দেন, যদিও তাপস তখনই ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থান করছিলেন এবং ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে আটকে দেয়। এসময় তাপস হাসিনাকে অনুরোধ করেন যেন ইমিগ্রেশনের এক কর্মকর্তাকে ফোন দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করতে বলা হয়।
অডিও অনুযায়ী, হাসিনা তাকে পরামর্শ দেন প্রমিত নামে একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ফাইল পাঠাতে এবং সেক্রেটারি শাহ সালাউদ্দিনের মাধ্যমে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে জানিয়ে দিতে। তাপসের কণ্ঠে ছিল উদ্বেগ, তাড়াহুড়া ও আশঙ্কা—যা পুরো পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক নাটকীয়তা এবং অনিশ্চয়তা প্রতিফলিত করে।
এই ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর ভিতরে আসলে কী ধরনের ভীতি ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল যে একজন নগর প্রধান এভাবে গোপনে দেশত্যাগের চেষ্টা করেন? এও প্রশ্ন উঠছে—শেখ হাসিনা ঠিক কোন পরিস্থিতিতে তার এত ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয়কে এমন অনুমতি দিয়েছিলেন, যখন রাষ্ট্র পরিচালনায় তার দলের নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছিল?
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অডিওর সত্যতা যাচাই এখন সময়ের দাবি হলেও, এতে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ঠিক আগের দিনগুলোতে সরকার অভ্যন্তরে ছিল তীব্র দুর্ভাবনা, অভ্যন্তরীণ অবিশ্বাস এবং আত্মরক্ষার চেষ্টা। শেখ তাপসের সেই ফোনালাপ তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থানের সংকটকেও নগ্নভাবে উন্মোচন করেছে।
অন্যদিকে, এই অডিও ফাঁসের মাত্র কয়েক মাস আগেই, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাপস এবং তার স্ত্রী আফরিন তাপসের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে। এ অভিযোগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল নাকি বৈধ অনুসন্ধানের ফসল—তা নিয়েও চলছে আলোচনা।
সামাজিক মাধ্যমে এই ফোনালাপ ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে দুই বিপরীতধর্মী প্রতিক্রিয়া। একপক্ষ একে রাজনৈতিক নাটক বলে অভিহিত করলেও, অন্যপক্ষ বলছে এটি শাসকের পতনের আগে অভ্যন্তরীণ বিচ্যুতির একটি প্রামাণ্য দলিল।
যদিও অডিওর উৎস ও প্রামাণিকতা এখনও সরকারিভাবে যাচাই করা হয়নি, তবে তাপস-হাসিনা সংলাপ ঘিরে জনমনে যেভাবে আলোড়ন উঠেছে, তা প্রমাণ করে—রাজনীতিতে গোপন কথোপকথনও একদিন জনতার আদালতে পৌঁছাতে পারে।
এখন প্রশ্ন শুধু একটাই—তথ্য ও প্রযুক্তির যুগে আর কিছু গোপন থাকে কি?