শিশুদের ক্ষতির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মামলার মুখে মেটা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮৩ বার
শিশুদের ক্ষতির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মামলার মুখে মেটা
প্রকাশ: ১০ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির স্বর্ণযুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেলেও এর নেতিবাচক প্রভাব এবং বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের ওপর এর ক্ষতিকর পরিণতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগ চলে আসছে। বিশ্ব প্রযুক্তির অন্যতম শীর্ষ পরাশক্তি ও ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান মেটা কর্পোরেশন ইতোমধ্যে আইনি জটিলতার ঘূর্ণাবর্তে আটকা পড়েছে। অতীতে বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলায় আইনি মারপ্যাঁচে জড়িয়ে পড়ার পর এবং প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণের আর্থিক বোঝা মাথার ওপর নিয়ে এবার আরও একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও যুগান্তকারী আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বিশ্বের এই শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি জায়ান্ট। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি সাধনের গুরুতর অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অঙ্গরাজ্যের সরকারের পক্ষ থেকে দায়ের করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল মামলার বিচারকার্য এখন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যা বিশ্ব প্রযুক্তি দুনিয়ায় এক নতুন পতন বা উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে বিগত বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাধারণ ব্যবহারকারী এবং অভিভাবকদের পক্ষ থেকে অসংখ্য আইনি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সেই সমস্ত মামলার ভিড়ে এবারের এই ফেডারেল মামলাটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে, যার বিচার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই। আগামী বুধবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ফ্রান্সিসকোর অকল্যান্ড শহরের একটি সুপরিচিত ফেডারেল আদালতে জুরি বোর্ডের সদস্য নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই বিচারিক কার্যক্রমের শুভসূচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর দীর্ঘ প্রস্তুতি ও প্রাথমিক ধাপ পেরিয়ে আগামী ১৮ আগস্ট থেকে মামলার উভয় পক্ষের আইনজীবীদের অংশগ্রহণে মূল শুনানি পর্ব শুরু হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। আইনি বিশ্লেষকদের ধারণা অনুযায়ী, টানা প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও তথ্যবহুল এই বিচার কার্যক্রম চলমান থাকার পর আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের দিকে এই বহুল আলোচিত মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হতে পারে। বিশ্ব প্রযুক্তি জগতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এবং মেটার বিনিয়োগকারীরা এই মামলার প্রতিটি আপডেট অত্যন্ত উৎকণ্ঠার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন।
এই ঐতিহাসিক মামলার মূল বাদীপক্ষ হিসেবে যৌথভাবে লড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের চারটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য—ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি এবং নিউ জার্সির সম্মানিত অ্যাটর্নি জেনারেলগণ। তারা যৌথভাবে দায়ের করা অভিযোগে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাবি করেছেন যে, বিশ্বের বৃহত্তম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটা জেনেশুনে, পরিকল্পিতভাবে এবং অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের জনপ্রিয় দুটি প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামকে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের জন্য অত্যন্ত আসক্তিকর করে তুলেছে। শিশুদের অবচেতন মন এবং মনোযোগ আকর্ষণের নানা মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ বা অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তাদের এই সাইটগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার ফলে তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়ছে। বাদীপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন যে, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মানসিক অবসাদ, আসক্তি, হীনম্মন্যতা এবং নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রবণতা বৃদ্ধির জন্য মেটার এই ব্যবসায়িক কৌশল সরাসরি দায়ী। এই অপরাধমূলক আচরণের দায়ভার এড়ানোর কোনো সুযোগ মেটার নেই বলে তারা আদালতকে অবহিত করেছেন।
অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং মেটার এই ধরনের অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের রাশ টেনে ধরতে বাদীপক্ষের অঙ্গরাজ্যগুলো অত্যন্ত কঠোর কিছু পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। তারা ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো অপ্রাপ্তবয়স্কদের পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ, বয়স যাচাইয়ের কঠোর ব্যবস্থা এবং আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপের জোর দাবি তুলেছেন। শুধু তাই নয়, শিশুদের মানসিক ক্ষতির উপযুক্ত প্রতিকার হিসেবে তারা মেটার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার জরিমানা আদায়ের দাবি করেছেন। এই বিশাল অংকের জরিমানার পরিসংখ্যানটি অত্যন্ত চমকপ্রদ, কারণ দাবিকৃত এই অর্থের পরিমাণ খোদ মেটা কর্পোরেশনের বর্তমান মোট বাজারমূল্যের প্রায় সমপরিমাণ। সর্বশেষ প্রকাশিত বাজার তথ্যানুযায়ী, গত শুক্রবারও মেটার মোট বাজারমূল্য ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সামান্য বেশি ছিল। ফলে আদালতের রায়ে যদি এই বিপুল পরিমাণ জরিমানা ধার্য হয়, তবে তা মেটার অস্তিত্বের জন্যই এক বিরাট বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
এই মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ও কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে থাকতে চলেছেন মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ। আইনি লড়াইয়ের এই পর্যায়ে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে মার্ক জাকারবার্গকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এর মাত্র ছয় মাস আগেও লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও ভিন্ন মামলায় তাকে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষ্য দিতে হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে মার্ক জাকারবার্গ যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপে অবস্থিত তার নিজ বাসভবনে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় কাটান বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সূত্রে জানা গেছে। তবে মেটার প্রধান কার্যালয় বা হেডকোয়ার্টার অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়ার মেনলো পার্কে, যা আলোচিত ওই আদালত ভবন থেকে গাড়ি চালিয়ে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। ফলে আদালতের সমন বা সাক্ষ্য দেওয়ার আহ্বানে তার পক্ষে সরাসরি উপস্থিত হওয়া খুব একটা কঠিন হবে না। সব মিলিয়ে, শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষা বনাম টেক জায়ান্টদের অবাধ মুনাফা অর্জনের এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত আদালতের রায় কার পক্ষে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com