জুলাই সনদ না মানলে বিএনপি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে: মঞ্জু

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
জুলাই সনদ না মানলে বিএনপি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে: মঞ্জু

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে বিএনপিকে জনগণ বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করবে বলে মন্তব্য করেছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তাঁর বক্তব্য, বিএনপি ক্ষমতায় থাকার পরও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে উদ্যোগী না হলে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা ব্যর্থ হওয়ার দায় দলটিকে নিতে হবে। আর কোনো কারণে বিএনপিকে ক্ষমতা ছাড়তে হলে সেই ব্যর্থতার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন মঞ্জু। সমাবেশে তিনি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায়, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, কর্মসংস্থান, দলীয় শৃঙ্খলা এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের বড় অংশজুড়েই ছিল বিএনপির প্রতি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা।

মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, বিএনপি জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এখন ক্ষমতায় থেকে গণভোটের রায় কিংবা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে মানুষ দলটিকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে বিবেচনা করবে। তাঁর মতে, জুলাই সনদের লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত না হলে শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ব্যর্থ হবে না, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর নিয়ে মানুষের প্রত্যাশাও বাধাগ্রস্ত হবে।

তিনি আরও বলেন, বিএনপি যদি কোনো কারণে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয় এবং জুলাই সনদের লক্ষ্য ব্যর্থ হয়, তাহলে এর দায় দলটিকে নিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপিও ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জুলুম-নিপীড়নের শিকার হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি সতর্কবার্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

সমাবেশে লংমার্চের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়েও কথা বলেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান। তিনি জানান, চলমান লংমার্চের একটি পর্যায় শেষের দিকে পৌঁছেছে। এরপর ঢাকায় সবাইকে নিয়ে সমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, গণভোটে অংশ নেওয়া প্রায় চার কোটি মানুষের রায়ের পক্ষে একটি বৃহত্তর মঞ্চ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিরোধীদলীয় নেতা ও অন্যান্য জাতীয় নেতাদেরও এ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মঞ্জুর অভিযোগ, বিএনপি জুলাই সনদের বিষয়টি নিয়ে অক্ষর ও ব্যাখ্যার জটিলতায় আলোচনাকে আটকে রাখতে চাইছে। তবে তাঁর মতে, সনদের মূল লক্ষ্য ও গণভোটের রায়কে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।

শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করেও সমাবেশে বক্তব্য দেন মঞ্জু। তিনি বলেন, ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে শেখ হাসিনা চাইলে নভেম্বরে দেশে ফিরে আসতে পারেন। জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের স্মৃতি ও ক্ষত এখনো মানুষের মনে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর দেশে ফেরার বিষয়ে তাঁরা প্রস্তুত আছেন। বক্তব্যটি ছিল রাজনৈতিকভাবে তীব্র ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের অবস্থান কিংবা পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে সমাবেশে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি নির্বাচনের আগে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে কর্মসংস্থানের সংকট এবং শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার প্রসঙ্গও উঠে আসে। সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, চার শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।

বক্তব্যে কয়েকজন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তির চাকরির অবস্থান নিয়েও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন মঞ্জু। তবে এসব বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। ফলে তাঁর মন্তব্যগুলো রাজনৈতিক সমালোচনা ও বক্তব্য হিসেবেই বিবেচ্য। কর্মসংস্থান ও শিল্প খাতের পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি বাস্তব তথ্য, সরকারি পরিসংখ্যান এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন প্রয়োজন।

বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের তুলনা টেনে দলীয় শৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মঞ্জু। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বছরে দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বে ৩৮ জন নেতা নিহত হয়েছিলেন। অন্যদিকে বিএনপির আট মাসের সময়ে এ ধরনের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৪৫ ছাড়িয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এ তুলনার মাধ্যমে তিনি দুই দলের রাজনৈতিক আচরণ ও সাংগঠনিক পরিস্থিতির মধ্যে মিল রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তবে তাঁর উত্থাপিত সংখ্যাগুলোর স্বাধীন যাচাই বা বিস্তারিত পরিসংখ্যান সমাবেশে তুলে ধরা হয়নি। তাই এসব দাবি যাচাইয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।

বিএনপির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিয়েও সমালোচনা করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান। তাঁর দাবি, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপির প্রায় আট হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করতে হয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি দলটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে বহিষ্কারের সংখ্যা ও কারণ সম্পর্কে বিএনপির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সমাবেশে উল্লেখ করা হয়নি।

মঞ্জু বলেন, জুলাই সনদ কেবল রাজনৈতিক নেতাদের স্বাক্ষর বা কাগজে লেখা কোনো দলিল নয়; এটি মানুষের আন্দোলন, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে এই সনদের সম্পর্ক রয়েছে। তাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। প্রয়োজনে আবারও রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।

তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুধু কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। গণভোটে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের মতামত ও প্রত্যাশাকে সামনে রেখে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য চার কোটি ভোটারের প্রতিনিধিত্বকারী একটি মঞ্চ তৈরির প্রস্তাব দেন তিনি। তাঁর মতে, এই মঞ্চের মাধ্যমে জনগণের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজনৈতিক চাপ আরও জোরালো করা সম্ভব হবে।

সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এলডিপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ছোবহানী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দামসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে মতপার্থক্য এবং দলগুলোর অবস্থান এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে সনদের বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায় কার্যকরের দাবি জানাচ্ছে ১১ দলীয় ঐক্য; অন্যদিকে সনদের বিভিন্ন বিষয়, ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা, সমঝোতা এবং সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

মজিবুর রহমান মঞ্জুর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য তাদের আন্দোলন আরও বিস্তৃত করতে চায়। ঢাকায় পরবর্তী সমাবেশ এবং গণভোটে অংশ নেওয়া মানুষের পক্ষে বৃহত্তর মঞ্চ গঠনের পরিকল্পনা সেই রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তবে এ আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি কী হবে এবং বিএনপি এ দাবির বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, তা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে চলমান বিতর্ক শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমঝোতা, জনমত ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কোন পথে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com