১০ দিন পর এক দিনের জন্য শিথিল হচ্ছে সাজেক অবরোধ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২ বার
১০ দিন পর এক দিনের জন্য শিথিল হচ্ছে সাজেক অবরোধ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে টানা ১০ দিন ধরে চলা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ এক দিনের জন্য শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনরত দুটি সংগঠন। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন, ভোগান্তি এবং ধর্মীয় উৎসবের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আগামীকাল রোববার (১ নভেম্বর) অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই শিথিলতা স্থায়ী নয়। সংগঠন দুটির ঘোষণা অনুযায়ী, পরদিন সোমবার থেকে পূর্বঘোষিত অনির্দিষ্টকালের অবরোধ আবারও কার্যকর হবে।

শুক্রবার রাতে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানায় সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠন দুটির পক্ষে বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেন বাবুধন চাকমা ও নতুন জয় চাকমা। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় যে অসুবিধা তৈরি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে এক দিনের জন্য কর্মসূচি শিথিল করা হচ্ছে। তবে তাদের দাবিগুলোর বিষয়ে কোনো সমাধান না আসায় পরবর্তী সময়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত রয়েছে।

অবরোধ শিথিলের ঘোষণায় সাজেকের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সাময়িক স্বস্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন সড়ক যোগাযোগ সীমিত থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ, যাতায়াত এবং অন্যান্য জরুরি কাজে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছিল সাধারণ মানুষকে। পাহাড়ি এই পর্যটন এলাকায় সড়ক যোগাযোগের ওপর স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে অবরোধের প্রভাব শুধু পর্যটন খাতে নয়, স্থানীয় পরিবার, ব্যবসায়ী, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাধারণ বাসিন্দাদের ওপরও পড়েছে।

বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া, বাজার থেকে খাদ্যসামগ্রী আনা কিংবা চিকিৎসার জন্য অন্য এলাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রে সড়ক অবরোধ বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় এ ধরনের কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। আন্দোলনকারী সংগঠন দুটি নিজেদের ঘোষণায় মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। এক দিনের এই বিরতি স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় আয়োজন কঠিন চীবর দানোৎসবের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সংগঠন দুটি জানিয়েছে, উৎসবটি যেন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে উদ্‌যাপন করা যায়, সে জন্য আলোচনা সাপেক্ষে বিশেষ শিথিলতার ব্যবস্থা রাখা হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা বৌদ্ধবিহার কর্তৃপক্ষকে দ্রুত আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

কঠিন চীবর দানোৎসব বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এ আয়োজনকে ঘিরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, পূজা, প্রার্থনা এবং চীবর দানের মতো কর্মসূচি পালিত হয়। স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এটি ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই চলমান অবরোধের মধ্যেও উৎসবের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ধর্মীয় আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

গত ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। এটি সংগঠন দুটির পক্ষ থেকে দেওয়া তৃতীয় দফার অবরোধ। তাদের অন্যতম প্রধান দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (সন্তু লারমা-সমর্থিত জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া। সংগঠন দুটির অভিযোগ, সশস্ত্র তৎপরতার কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে জেএসএস। সংগঠনটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেছেন, সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির বিষয়টি আড়াল করতেই মনগড়া অভিযোগ তোলা হচ্ছে। ফলে সাজেকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যে প্রকৃত পরিস্থিতি নিরূপণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে উঠেছে।

সাজেকে অবরোধ কর্মসূচির সূচনা হয় ১১ অক্টোবর। ওই দিন তিন দফা দাবিতে এক দিনের অবরোধ পালন করে সংগঠন দুটি। পরে ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় আবার অবরোধের ডাক দেওয়া হয়। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছিল। পূজা শেষে ২১ অক্টোবর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়। সেই ঘোষণা অনুযায়ী ২২ অক্টোবর সকাল থেকে সাজেকের পর্যটন সড়কে অবরোধ শুরু হয়।

নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। প্রশাসনের নির্দেশনার পর ২২ অক্টোবর সকাল থেকে পর্যটকেরা সাজেক ছাড়তে শুরু করেন। তবে ফেরার পথে উজো বাজার এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এ ঘটনায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের গুলি চালানোর অভিযোগ করা হয়। তবে ইউপিডিএফ সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে ঘটনাটির দায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।

সাজেকের মতো দুর্গম পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ বা সীমিত হয়ে গেলে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং স্থানীয় পণ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক পরিবার পর্যটননির্ভর ছোট ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। পর্যটক না থাকলে এসব ব্যবসার দৈনন্দিন আয় কমে যায়। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকলে স্থানীয় কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা পর্যটন চালুর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে পর্যটকদের যাতায়াত স্বাভাবিক করা কঠিন। তাই পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রয়োজন। শুধু অবরোধ শিথিল বা পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়; স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার এবং স্বাভাবিক চলাচলের নিশ্চয়তাও সমানভাবে জরুরি।

এদিকে অবরোধ চলাকালে হামলা, লাঠিপেটা এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন ২৪ অক্টোবর রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অর্ধদিবস অবরোধ পালন করে। সংগঠনটি সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ওই কর্মসূচি পালন করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে সাজেকের পরিস্থিতি স্থানীয় পর্যায় ছাড়িয়ে পার্বত্য অঞ্চলের বৃহত্তর জনপরিসরেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

আগামীকাল এক দিনের জন্য অবরোধ শিথিল হলেও সাজেকের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কারণ আন্দোলনকারী সংগঠন দুটি সোমবার থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে কঠিন চীবর দানোৎসব উপলক্ষে বিশেষ শিথিলতার বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণের কথা জানিয়েছে তারা।

সাজেকের স্থানীয় বাসিন্দারা এখন নিরাপদ চলাচল, প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা করছেন। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এড়াতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সংযম, আলোচনায় অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানই হতে পারে সাজেকের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com