প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এতে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে বের হবে বাংলাদেশ। বাড়তি এই সময় রপ্তানি খাতের ঝুঁকি মোকাবিলা, অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা, সময় বাড়লেই সমস্যার সমাধান হবে না; এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে এখন থেকেই কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।
বৃহস্পতিবার রাতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্লেনারি অধিবেশনে বাংলাদেশ ও নেপালের উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। জি-৭৭ গ্রুপের পক্ষে উরুগুয়ের প্রতিনিধি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। কোনো দেশ এর বিরোধিতা করেনি। ফ্রান্স, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের আবেদনের প্রতি সমর্থন জানান। তবে তাঁদের বক্তব্যে অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বহিরাগত অভিঘাত এবং অব্যাহত ঝুঁকির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ও নেপালকে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত তিন বছর দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, সময় বাড়ানো মানে পিছিয়ে যাওয়া নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই অগ্রগতির জন্য এটি একটি বিনিয়োগ। উত্তরণ এমনভাবে হওয়া প্রয়োজন, যাতে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ব্যাহত না হয়।
বাংলাদেশের আবেদনের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা কাজ করেছে। এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বর্তমানে পাওয়া অনেক অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা আর আগের মতো থাকবে না। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজারগুলোতে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্বসংক্রান্ত বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণের প্রয়োজন হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া সহজ শর্তের ঋণ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহায়তার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে।
সরকার ও বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা ছিল, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পের মতো রপ্তানিনির্ভর খাত নতুন শুল্কের চাপে পড়তে পারে। এ ছাড়া উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামাল আমদানি, নগদ সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখার বিষয়গুলোও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বাড়তি সময় পাওয়াকে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে গড়ে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ শুল্কের অভিঘাত আসতে পারে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই চাপ মোকাবিলা কঠিন হতো। তাই যথাযথ প্রস্তুতির মাধ্যমে উত্তরণকে মসৃণ ও টেকসই করার জন্য বাড়তি সময় প্রয়োজন ছিল।
মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের পণ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন, বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে।
রপ্তানিকারকদের মধ্যেও জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বস্তি দেখা গেছে। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এ সিদ্ধান্তকে রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশ এই অতিরিক্ত সময় পেয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, আগামী তিন বছরে অর্থনীতির রূপান্তর, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার সুসংহত করা না গেলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদরাও বাড়তি সময়কে সুযোগ হিসেবে দেখছেন, তবে তাঁরা সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের মতে, এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় পেয়েছে। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং অসম্পূর্ণ কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়টিও সামনে এনেছে।
তাঁর মতে, করোনাভাইরাস মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং রাজনৈতিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের উত্তরণ প্রস্তুতিকে কঠিন করে তুলেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো জরুরি।
এ ছাড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তাঁর সতর্কতা, এসব উদ্যোগ যেন শুধু নীতিগত ঘোষণা বা সরকারি পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বাস্তব অর্থনীতিতে সংস্কারের সুফল দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। ২০২৯ সাল এলেই দেশের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর স্বয়ংক্রিয় সমাধান হবে না।
এলডিসি উত্তরণের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রাক্কলনও বাংলাদেশের উদ্বেগের কারণ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ২০২০ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, এলডিসি সুবিধা হারালে বাংলাদেশের রপ্তানি ১৪ দশমিক ২৮ শতাংশ বা প্রায় ৫৩৭ কোটি ডলার কমতে পারে। ওই গবেষণায় ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের গড় রপ্তানি এবং ২০১৬ সালের শুল্কহার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তৈরি পোশাক খাতকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে সম্ভাব্য রপ্তানি ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের রপ্তানির ভিত্তিতে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হারানোর কারণে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি প্রায় ৩২ শতাংশ বা ১ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার কমতে পারে বলে প্রতিবেদনে প্রাক্কলন করা হয়েছে। তৈরি পোশাক ও জুতা খাতকে এ ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকা খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এসব প্রাক্কলন সম্ভাব্য পরিস্থিতির হিসাব; বাস্তব ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যনীতি, বাজার পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের প্রস্তুতির ওপর।
বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এলডিসির তালিকাভুক্ত হয়। এরপর থেকে দেশটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা ভোগ করে আসছে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি প্রতি তিন বছর পরপর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর অগ্রগতি মূল্যায়ন করে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিনটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে উত্তরণের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। এর ভিত্তিতে ২০২৪ সালে উত্তরণের সুপারিশ করা হয়েছিল। করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব ও প্রস্তুতির প্রয়োজন বিবেচনায় এর আগে উত্তরণের সময় দুই বছর বাড়ানো হয়।
পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের কাছে তিন বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হয়। সরকারের দাবি, নতুন সময়সীমা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।
অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্ধিত প্রস্তুতিকালে অন্তত ২৫টি সংস্কার ও প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্য, আর্থিক খাত, রাজস্বব্যবস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য বা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। জাপানের সঙ্গে ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতেও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা বাড়ানো, সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আইন প্রণয়ন এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো এবং অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা।
জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তবে এই সুযোগের সঙ্গে দায়িত্বও বেড়েছে। অতিরিক্ত তিন বছরকে কেবল সময় অর্জন হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করতে হবে। ২০২৯ সালের উত্তরণ যেন দেশের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত না করে, সে জন্য এখন থেকেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন জরুরি। শেষ পর্যন্ত বাড়তি সময়ের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে তার ওপর।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত