সৌদির আগুনে নিহত ৭ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পৌঁছেছে

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২ বার
সৌদির আগুনে নিহত ৭ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পৌঁছেছে

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশি শ্রমিকের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ৮টা ২১ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে মরদেহগুলো ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফেরায় স্বজনদের মধ্যে একদিকে যেমন শোকের আবহ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে শেষবারের মতো আপনজনকে দেখার অপেক্ষাও শেষ হয়েছে।

নিহত সাত বাংলাদেশির মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি নওগাঁ জেলায় এবং দুজনের বাড়ি নাটোরে। তারা জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানো, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা এবং স্বজনদের জন্য কিছুটা ভালো জীবন গড়ার আশায় দূর দেশে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তারা। কিন্তু কর্মস্থলের ভয়াবহ আগুন তাদের সেই স্বপ্নের পথ থামিয়ে দিয়েছে।

গত ৯ আগস্ট রিয়াদের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। ওই অগ্নিকাণ্ডে মোট ১৬ বাংলাদেশি কর্মী নিহত হন। দুর্ঘটনার পর নিহতদের মরদেহ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিচয় শনাক্ত করার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়। প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হওয়া নয়জনের মরদেহ গত ২৭ আগস্ট দেশে পাঠানো হয়েছিল। তবে বাকি সাতজনের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করতে হয়।

পরিচয় শনাক্তকরণের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর অবশেষে সেই সাতজনের মরদেহও দেশে ফেরত আনা হলো। ফলে ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় নিহত ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে শেষ পর্যায়ে আটকে থাকা মরদেহগুলোও এখন স্বজনদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য এটি ছিল গভীর উৎকণ্ঠার সময়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কাউন্সেলর (শ্রম) মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বী জানিয়েছেন, গত ১০ অক্টোবর থেকে রিয়াদ থেকে ঢাকার সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ থাকায় মরদেহগুলো সড়কপথে জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে বিমানে করে মরদেহগুলো ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

মরদেহ দেশে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিহতদের নিজ নিজ এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। নওগাঁ ও নাটোরের গ্রামগুলোতে স্বজনদের মধ্যে কান্না ও আহাজারি নেমে এসেছে। দূর দেশে কর্মরত একজন মানুষের আকস্মিক মৃত্যু যেমন একটি পরিবারকে অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে ফেলে দেয়, তেমনি মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দীর্ঘ অপেক্ষাও স্বজনদের জন্য হয়ে ওঠে অসহনীয়।

নিহতদের মধ্যে নওগাঁ সদর উপজেলার পার নওগাঁ গ্রামের শাহিন রয়েছেন। তার স্ত্রী পারভীনের কণ্ঠে স্বামীর মৃত্যুর গভীর শোক ফুটে উঠেছে। তিনি জানিয়েছেন, স্বামীকে হারানোর ক্ষতি আর পূরণ হওয়ার নয়। এখন অন্তত মরদেহ দেশে থাকলে সন্তানরা বাবার শেষ দেখা দেখতে পারবে। একজন স্বজনের এই আকুতি প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর পর পরিবারের ওপর নেমে আসা গভীর মানবিক বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।

নিহত অন্যদের মধ্যে রয়েছেন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার দুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার এবং সাহানগর গ্রামের সাগর আলী। নাটোরের লালপুর উপজেলার দীঘিরপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ শামীম এবং খাজুরা গ্রামের শরিফ হোসেনও এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

তাদের প্রত্যেকের পরিবারের সঙ্গে মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর থেকেই অপেক্ষা ছিল মরদেহ দেশে ফেরার। প্রবাসে কর্মরত স্বজনের মৃত্যুর সংবাদ পরিবারকে এক মুহূর্তে যে শূন্যতার মধ্যে ঠেলে দেয়, মরদেহ দেশে না আসা পর্যন্ত সেই শোক যেন পূর্ণতা পায় না। শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখা, ধর্মীয় ও পারিবারিক রীতিতে দাফন করা এবং আপনজনের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পাওয়াটাই তখন পরিবারের প্রধান প্রত্যাশা হয়ে ওঠে।

নওগাঁর আত্রাই উপজেলা প্রশাসনও নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জমান জানিয়েছেন, স্বজনদের সঙ্গে প্রশাসনের যোগাযোগ রয়েছে এবং মরদেহ দাফনের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া হবে। ফলে মরদেহ বিমানবন্দর থেকে নিজ নিজ এলাকায় নেওয়া এবং পরবর্তী দাফন কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য কর্মস্থলের নিরাপত্তা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিদেশে গিয়ে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও অনেক শ্রমিক বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন। নির্মাণ, কারখানা, শিল্প ও অন্যান্য খাতে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। রিয়াদের সোফা কারখানার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একসঙ্গে ১৬ বাংলাদেশির প্রাণহানি সেই নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে।

প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনেকেই পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভর করে সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় এবং ভবিষ্যতের নানা পরিকল্পনা। ফলে একজন প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানি নয়, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তিতেও বড় ধাক্কা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে আকস্মিক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে পরিবারের সদস্যরা একই সঙ্গে প্রিয়জন হারানোর শোক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন।

রিয়াদের ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সময় বেশি লেগেছে। পরিচয় নিশ্চিত না করে মরদেহ হস্তান্তর করা সম্ভব নয়। তাই পরিবারগুলোর জন্য অপেক্ষাটি দীর্ঘ হলেও শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই মরদেহ দেশে আনা হয়েছে। এতে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে তাদের মরদেহ হস্তান্তরের পথ সুগম হয়েছে।

শনিবার সকালে মরদেহগুলো ঢাকায় পৌঁছানোর পর এখন সেগুলো নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হবে। সেখানে পরিবারের সদস্যরা শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখবেন। এরপর ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শোকাহত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে স্থানীয় প্রশাসনও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

দূরদেশে কর্মরত এসব শ্রমিকের জীবনের শেষ পরিণতি পরিবারগুলোর জন্য যে বেদনা তৈরি করেছে, তা সহজে কাটিয়ে ওঠার নয়। যে মানুষগুলো পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এবং ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে গিয়েছিলেন, তাদের ফিরতে হলো নিথর দেহে। স্বজনদের কাছে এখন আর কোনো প্রত্যাশা নেই—শুধু শেষ বিদায়টুকু যেন আপনজনদের উপস্থিতিতে সম্পন্ন করতে পারেন।

রিয়াদের অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। তবে পরিবারগুলোর জীবনে রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং এমন ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এখন সংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ দেশের বাইরে কর্মরত প্রতিটি বাংলাদেশির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবার, বহু স্বপ্ন এবং দেশে অপেক্ষায় থাকা অসংখ্য প্রিয় মুখ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com