বিএনপির মধ্যে স্বৈরাচারী প্রবণতা দেখছে এনসিপি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৩ বার
বিএনপির মধ্যে স্বৈরাচারী প্রবণতা দেখছে এনসিপি

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
 বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপির মধ্যে স্বৈরাচারী আচরণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বিরোধী দলের কর্মসূচিতে হামলা, সমালোচকদের গ্রেপ্তার এবং সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের অনীহা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দলটি। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও মনে করে এনসিপি।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (ইউকে হোম অফিস) প্রকাশিত বাংলাদেশবিষয়ক একটি তথ্য অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এনসিপির একজন সংসদ সদস্যের সাক্ষাৎকারে এসব বক্তব্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, বিরোধী দলের কার্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতা, পুলিশি আচরণ, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক সহিংসতার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৭ জুন ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনে এনসিপির সংসদ সদস্য নাভিদ নওরোজ শাহের সাক্ষাৎকার নেন যুক্তরাজ্যের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিমের (সিপিআইটি) তিন কর্মকর্তা। এ সময় যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তরের একজন কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষাৎকারটি ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত ‘রিপোর্ট অব আ ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন বাংলাদেশ: পলিটিক্যাল সিচুয়েশন, অক্টোবর ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

সাক্ষাৎকারে এনসিপির সংসদ সদস্য বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করা। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণে অগ্রগতি এখনো সীমিত।

সাক্ষাৎকারে এনসিপির সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন, বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর আচরণে বিরোধী মত দমনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে এনসিপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা, সমাবেশের স্থান ভাঙচুর এবং দলের নেতাদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাকে তিনি উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহে এনসিপির তিন সদস্যকে আক্রমণের পর পুলিশ তাঁদেরই গ্রেপ্তার করে ঈদের সময় কারাগারে পাঠিয়েছিল। ওই ঘটনাকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তার হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষ বা বিএনপির বক্তব্য সাক্ষাৎকারের উদ্ধৃত অংশে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এনসিপির এই নেতার মতে, বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে সরকারের সমালোচনা করা এবং নিজেদের কর্মসূচি পরিচালনা করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে অসমতা তৈরি হতে পারে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিএনপি দ্রুত এ ধরনের প্রবণতা থেকে সরে আসবে। তাঁর মতে, বর্তমান সরকারকে দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজ করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন, তবে সেই সুযোগের অর্থ বিরোধী দলের অধিকার ও দায়িত্ব উপেক্ষা করা নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে এনসিপির সংসদ সদস্য পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের প্রতি পুলিশের পক্ষপাতিত্বের প্রবণতা আগের মতোই পুরোপুরি দূর হয়নি।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে পুলিশ ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ নিত বলে তাঁদের অভিজ্ঞতা ছিল। বর্তমান সরকারের অধীনেও কিছু ঘটনায় একই ধরনের আচরণের অভিযোগ উঠছে।

তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন যে, সামগ্রিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো। সাধারণ মানুষ এখন তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে প্রতিবাদ করতে পারছেন এবং রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের সুযোগ বেড়েছে। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করলে কিছু ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা থাকলেও সেটি এখনো সব ক্ষেত্রের সাধারণ চিত্র নয়।

সাক্ষাৎকারে তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারের সমালোচনা করার কারণে গত ১০০ দিনে ছয় থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা উদ্বেগজনক। তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয়, মামলার বিবরণ এবং অভিযোগের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উদ্ধৃত অংশে দেওয়া হয়নি।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুলিশের নিরপেক্ষতা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়; এটি নাগরিকের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অধিকার এবং বিচার পাওয়ার সুযোগের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই রাজনৈতিক বিরোধের ঘটনায় অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের অধিকার রক্ষা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

সাক্ষাৎকারে এনসিপির অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও জুলাই সনদের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়টি। দলটির সংসদ সদস্যের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ সময় ধরে নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সংস্কারের প্রস্তাব তৈরি করেছিল। পরে জুলাই সনদ জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয় এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তাঁর দাবি, জনগণের এই সমর্থনের পরও সরকার সংস্কার বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে না। নির্বাচনী অঙ্গীকারে যেসব পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে তিনি মনে করেন।

বিচার বিভাগের জন্য স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার অভিযোগও তোলেন তিনি। তাঁর মতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন জরুরি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতেও এমন পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা যায় এবং প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

তবে জুলাই সনদ, গণভোটের ফলাফল এবং সরকারের সংস্কারসংক্রান্ত পদক্ষেপের পূর্ণাঙ্গ আইনগত অবস্থান নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সাক্ষাৎকারে উত্থাপিত বক্তব্য এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে; এগুলোকে সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না।

এনসিপির সংসদ সদস্য বলেন, দলটি এখনো সংসদের ভেতরে সংস্কারের পক্ষে কথা বলছে। তবে সংস্কার বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হলে ভবিষ্যতে রাজপথে আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে।

সাক্ষাৎকারে এনসিপির রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কর্মসূচি সম্পর্কেও বিস্তারিত তুলে ধরেন নাভিদ নওরোজ শাহ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলটির প্রধান অগ্রাধিকার রাষ্ট্রীয় সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বিশেষ করে তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ তৈরি না হলে গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশিত পরিবর্তন বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলে মনে করে দলটি।

তিনি জানান, সরকারি বাজেট ঘোষণার আগে এনসিপি একটি বিকল্প বাজেট প্রস্তাব দিয়েছিল। সেখানে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর মতে, দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ থাকলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে অনেকেই ভালো চাকরি পাচ্ছেন না। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানো গেলে তাঁদের আয় ও দেশে পাঠানো রেমিট্যান্স—দুটিই বাড়তে পারে।

এনসিপির সংসদ সদস্য আরও বলেন, দলটির সমর্থকদের বড় অংশ তরুণ। তবে শহরাঞ্চলের বাইরে সংগঠন বিস্তারে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় স্থানীয় নেতৃত্ব ও প্রবীণ ব্যক্তিদের প্রভাব বেশি থাকায় সেখানে মানুষের আস্থা অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়েও সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে নাভিদ নওরোজ শাহ বলেন, দুই দলের আদর্শগত অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে। এনসিপি নিজেদের মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করে। তবে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের দাবিতে অভিন্ন অবস্থানের কারণে জামায়াতের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই সহযোগিতা মানে সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ধর্মের ভূমিকার মতো বিষয়ে জামায়াতের অবস্থানের সমালোচনাও করে এনসিপি। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটি নিজেদের শক্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রয়োজন হলে অন্য দলের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার বিষয়টিও বিবেচনা করা হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের তথ্য অনুসন্ধান প্রতিবেদনে শুধু এনসিপির বক্তব্য নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক, গবেষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের মতামতও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে এবং আগের তুলনায় রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ বেড়েছে। তবে দুর্নীতি, পুলিশের জবাবদিহি, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে, এনসিপির এই বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংস্কার বাস্তবায়ন, বিরোধী দলের অধিকার, পুলিশের নিরপেক্ষতা এবং ক্ষমতাসীন দলের জবাবদিহি নিয়ে চলমান বিতর্ককে সামনে এনেছে। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটিই আগামী দিনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনের জন্য জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com