দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়া শিক্ষার্থীরা এখন একদিকে নিয়মিত পড়াশোনায় ফিরতে চান, অন্যদিকে নিজেদের দাবির প্রতিও অনড় থাকতে চাইছেন। তাঁদের বক্তব্য, ক্লাসে ফিরে যাওয়া মানে আন্দোলন থেকে সরে আসা নয়; বরং শিক্ষাজীবনের ক্ষতি কমিয়ে সংকটের সম্মানজনক সমাধানের পথ খোঁজা।
বিশ্ববিদ্যালয়টির চলমান পরিস্থিতিতে তাই একদিকে পাঠদান শুরুর উদ্যোগ, অন্যদিকে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে মতবিরোধ—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংকট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গঠিত পরামর্শক কমিটির শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের কথা রয়েছে বুধবার।
বুধবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগসহ কয়েকটি বিভাগে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলতে দেখা গেছে। তবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর ক্লাস শুরু হওয়ায় একাডেমিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে বলে পরিস্থিতি থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ফৌজিয়া গুলশানা রশিদ জানিয়েছেন, তাঁদের বিভাগে সব ব্যাচের ক্লাস শুরু হয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়েছেন বলেও তিনি জানান।
তবে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ এবং বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে বুধবার ক্লাস শুরু হয়নি। বিভাগ দুটির সূত্রে জানা গেছে, ক্লাস শুরুর প্রস্তুতি থাকলেও ইউজিসির পরামর্শক কমিটির সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বৈঠক নির্ধারিত থাকায় তাঁরা সেদিন বিভাগে উপস্থিত হননি। বৃহস্পতিবার থেকে ক্লাস শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন, তাঁদের বিভাগ পাঠদান শুরুর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল। তবে ইউজিসির পরামর্শক কমিটির সঙ্গে বৈঠক থাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসেননি।
কম্পিউটারবিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগেও বুধবার পাঠদান শুরু হয়নি। বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক প্রণব কুমার ধর জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ক্লাস শুরু করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। কোর্স সমন্বয়কের মাধ্যমে আবেদন করা হলে তা বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিভাগভেদে ক্লাস শুরুর এই ভিন্নতা থেকে স্পষ্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম সচল করার প্রক্রিয়া শুরু হলেও সব জায়গায় তা একই গতিতে এগোচ্ছে না।
দীর্ঘদিন ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নাফিস হাসান বলেন, দীর্ঘদিন পাঠদান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। দ্রুত স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন থেকেই তাঁরা ক্লাস শুরু করছেন।
তবে ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্তকে উপাচার্য পুনর্বহালের দাবি থেকে সরে আসা হিসেবে দেখছেন না শিক্ষার্থীরা। নাফিস হাসানের ভাষ্য, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে তাঁদের আন্দোলন চলবে। তাঁরা সংঘাতের পরিবর্তে সংকটের সম্মানজনক সমাধান চান।
এই অবস্থান থেকে শিক্ষার্থীদের প্রধান প্রত্যাশা হলো, একাডেমিক কার্যক্রম সচল রাখার পাশাপাশি উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ ও দাবিগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিনের শাটডাউন শুধু ক্লাস বন্ধ থাকার বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পরীক্ষার সময়সূচি, কোর্স সম্পন্ন করা, শিক্ষাবর্ষের ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। বিশেষ করে প্রকৌশল শিক্ষায় তাত্ত্বিক পাঠের পাশাপাশি ব্যবহারিক ক্লাস, ল্যাবরেটরির কাজ ও প্রকল্প সম্পন্ন করার বিষয় থাকায় দীর্ঘ বিরতির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে বিভাগগুলোকে বাড়তি সমন্বয় করতে হতে পারে।
শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার প্রক্রিয়ায় শিক্ষক সমিতিও ভূমিকা রেখেছে। গত রোববার (২৫ অক্টোবর) শিক্ষার্থীরা পাঠদান শুরু করতে শিক্ষকদের সহযোগিতা চেয়ে একটি খোলা চিঠি দেন। একই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা শেষে শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সামিউন বাসির জানান, ক্লাস শুরুর তারিখ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো নিজেদের সুবিধা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারণ করবে।
এরপর রোববার রাতে এক বিবৃতিতে বুধবার থেকে ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা জানান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাঁদের এই সিদ্ধান্তকে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালুর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ক্লাস শুরু হওয়া মানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক সংকটের অবসান নয়। উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিরোধের সমাধান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একাডেমিক কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
চুয়েটের চলমান অচলাবস্থা নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইউজিসি ছয় সদস্যের একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করেছে। কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুন। সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সংস্থাটির অতিরিক্ত পরিচালক মো. মহিবুল আহসান।
কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) উপাচার্যরা। এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী কমিটিতে রয়েছেন।
নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, বুধবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের কথা রয়েছে। এরপর বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা। বেলা আড়াইটা থেকে ৩টা পর্যন্ত কর্মকর্তা এবং বেলা সাড়ে ৩টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য শোনার মাধ্যমে সংকটের কারণ, পারস্পরিক উদ্বেগ এবং সম্ভাব্য সমাধানের পথ চিহ্নিত করাই এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে কমিটির মতবিনিময়ের ফলাফল কী হবে এবং তা উপাচার্য নিয়োগসংক্রান্ত বিরোধ নিরসনে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে।
চুয়েটে বর্তমান অচলাবস্থার সূত্রপাত গত ২১ সেপ্টেম্বর। ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যেও কর্মবিরতি চলে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
সংকটের মধ্যে গত ১২ অক্টোবর সকালে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি উপাচার্য ভবনের তালা ভেঙে নিজের দপ্তরে প্রবেশ করেন।
বিষয়টি জানতে পেরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ওই দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান নিতে শুরু করেন। দুপুর ১২টার মধ্যে উপাচার্যকে কার্যালয় থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেন তাঁরা। পরে ভবনের ফটকে তালা দেওয়া হয় এবং বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এর ফলে উপাচার্যসহ ভবনের ভেতরে থাকা ১১ জন আটকা পড়েন। পরদিন উপাচার্য অসুস্থ বোধ করার কথা জানান। তাঁকে পরীক্ষা করতে দুই চিকিৎসক সেখানে যান। প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর তাঁদের উদ্ধার করা হয়। পরে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফেরার পর তিনি অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করেন।
এই ঘটনাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটকে আরও জটিল করে তোলে। উপাচার্য নিয়োগের বিরোধের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রশ্নও সামনে আসে।
৩৬ দিনের শাটডাউন শেষে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফেরা চুয়েটের শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালুর পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা এবং কয়েকটি বিভাগে ক্লাস শুরু না হওয়া থেকে বোঝা যাচ্ছে, সংকটের পূর্ণ সমাধান এখনো হয়নি।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের ক্ষতি কমিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিরোধের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সংলাপ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইউজিসির পরামর্শক কমিটির মতবিনিময় থেকে কোনো সমন্বিত উদ্যোগ বা সুপারিশ আসে কি না, সেদিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট সবার। শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবি অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন, তবে একই সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে সম্মানজনক সমাধানের প্রত্যাশাও প্রকাশ করেছেন।
চুয়েটের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ শুধু ক্লাস শুরু করা নয়; বরং শিক্ষা কার্যক্রমকে ধারাবাহিক ও স্থিতিশীল করা, শিক্ষার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং প্রশাসনিক বিরোধের সমাধান করা। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচনার মাধ্যমে এগোতে পারলে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আবারও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশে ফিরতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত