আইডিএলসির মুনাফা ১৮ শতাংশ বেড়ে ২০৭ কোটি টাকা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩৮ বার
আইডিএলসির মুনাফা ১৮ শতাংশ বেড়ে ২০৭ কোটি টাকা

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অন্যতম বেসরকারি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসির মুনাফা চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে প্রতিষ্ঠানটির সমন্বিত নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২০৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৭৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ৩১ কোটি টাকা বা প্রায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিক শেষে আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও অনুমোদন করা হয়। কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগ থেকে আয় বৃদ্ধি এবং অন্যান্য পরিচালন আয়ের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি মুনাফা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে ঋণের সুদ থেকে আয় বাড়লেও আমানত ও ধার করা অর্থের বিপরীতে সুদ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল সুদভিত্তিক ব্যবসায় কিছুটা চাপ রয়েছে। 

আইডিএলসি ফাইন্যান্সের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে ৩৫৩ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ২৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ থেকে আয় বেড়েছে ৯৩ কোটি টাকা বা প্রায় ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

প্রতিষ্ঠানটির মোট মুনাফা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া বাড়তি আয়ের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একই সময়ে ঋণ থেকে সুদ আয় বাড়লেও সুদ ব্যয় বৃদ্ধির ফলে মূল সুদভিত্তিক আয়ের চিত্র তুলনামূলক দুর্বল হয়েছে।

আর্থিক খাতে বিনিয়োগ থেকে আয় বিভিন্ন উৎসের মাধ্যমে আসতে পারে। এর মধ্যে বিনিয়োগপত্র, পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এবং অন্যান্য আর্থিক সম্পদ থেকে অর্জিত আয় থাকতে পারে। তবে আইডিএলসির বিনিয়োগ আয়ের বৃদ্ধির পেছনে কোন উপখাত কতটা অবদান রেখেছে, তা বিস্তারিত আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণ ছাড়া নির্দিষ্ট করে বলা যায় না।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মোট পরিচালন আয়ও বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে মোট পরিচালন আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৯৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। ফলে শুধু বিনিয়োগ থেকে আয় নয়, সামগ্রিক পরিচালন আয়ের প্রবৃদ্ধিও মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করেছে।

আইডিএলসি ফাইন্যান্সের মূল ব্যবসার একটি বড় অংশ হলো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া এবং সেই ঋণ থেকে সুদ আয় করা। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে প্রতিষ্ঠানটি ঋণের সুদ বাবদ আয় করেছে ১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ সুদ আয় বেড়েছে ৪৭ কোটি টাকা।

কিন্তু এই সময়ে আমানত সংগ্রহ এবং অন্যান্য উৎস থেকে ধার করা অর্থের বিপরীতে সুদ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা। ফলে ঋণের সুদ থেকে আয় বাড়লেও অর্থায়ন ব্যয়ের চাপ বেড়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমানতকারী ও ঋণদাতাদের অর্থের বিপরীতে যে সুদ দিতে হয় এবং ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে যে সুদ পাওয়া যায়, তার মধ্যকার ব্যবধান প্রতিষ্ঠানের মূল সুদভিত্তিক আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।

দ্য ডেইলি স্টারের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে আইডিএলসির নিট সুদ আয় আগের বছরের ২৮৭ কোটি টাকা থেকে কমে ২৬৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ সুদ আয় বাড়লেও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিট সুদ আয় কমেছে ২৪ কোটি টাকা। এ অবস্থায় বিনিয়োগ আয় ও অন্যান্য পরিচালন আয়ের প্রবৃদ্ধি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। 

নয় মাসের সামগ্রিক হিসাবে মুনাফায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি থাকলেও জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকের চিত্র তুলনামূলকভাবে সংযত। প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, এই তিন মাসে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের সমন্বিত নিট মুনাফা হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা। গত বছরের একই প্রান্তিকে তা ছিল প্রায় ৬৮ কোটি টাকা।

অর্থাৎ তৃতীয় প্রান্তিকে মুনাফা বেড়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা। একই সময়ে নিট সুদ আয় আগের বছরের ১০৯ কোটি টাকা থেকে কমে ৯৩ কোটি টাকায় নেমেছে। অন্যদিকে, বিনিয়োগ থেকে আয় ২৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, নয় মাসের মুনাফা বৃদ্ধির পুরো চিত্রটি বুঝতে হলে শুধু সর্বশেষ তিন মাসের ফলাফল দেখলে চলবে না। বছরের আগের দুই প্রান্তিকের আয়, ব্যয় এবং বিনিয়োগের ফলাফলও বিবেচনায় নিতে হবে। 

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব যথেষ্ট নয়। ঋণের গুণগত মান, খেলাপি ঋণের অনুপাত, সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে সংরক্ষিত অর্থ এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওনা আদায়ের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

ডেইলি সানের প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের অনুপাত কমে ৪ দশমিক ০৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। একই সময়ে খেলাপি ঋণের বিপরীতে সংরক্ষণের অনুপাত ছিল ১১০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিবেদনে উল্লিখিত হিসাবে, খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণের পরিমাণ তার চেয়েও বেশি ছিল। 

তবে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমা মানেই প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের ঝুঁকি দূর হয়ে গেছে—এমন নয়। ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক পরিস্থিতি, ঋণ আদায়ের গতি এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিবেশের ওপর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদের মান নির্ভর করে। এ কারণে মুনাফার পাশাপাশি এসব সূচকের ধারাবাহিক উন্নতিও গুরুত্বপূর্ণ।

আইডিএলসি ফাইন্যান্স দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠান। ঋণ ও আমানতসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী সংস্থা আইডিএলসি সিকিউরিটিজ, আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস এবং আইডিএলসি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টও বিভিন্ন আর্থিক সেবা দিয়ে থাকে।

প্রতিষ্ঠানটির বহুমুখী ব্যবসায়িক কাঠামো থেকে আয় আসার সুযোগ রয়েছে। ফলে কোনো একটি খাতে চাপ তৈরি হলে অন্য খাতের আয় সামগ্রিক ফলাফলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিভিন্ন খাতের আয় কতটা স্থিতিশীল, তা মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট উপখাতের পৃথক আর্থিক ফলাফল পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

আইডিএলসির চলতি বছরের প্রথম নয় মাসের ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগ থেকে আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি মোট পরিচালন আয়ও বেড়েছে। কিন্তু মূল সুদভিত্তিক আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্য পর্যবেক্ষণযোগ্য। বিনিয়োগ থেকে আয় বাজার পরিস্থিতি ও আর্থিক সম্পদের কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করতে পারে। অন্যদিকে ঋণ কার্যক্রম থেকে ধারাবাহিক আয় নিশ্চিত করতে অর্থায়ন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ঋণের মান বজায় রাখা এবং সময়মতো অর্থ আদায় গুরুত্বপূর্ণ।

আইডিএলসি ফাইন্যান্সের নয় মাসের মুনাফা বৃদ্ধির খবর প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ফলাফলে ইতিবাচক প্রবণতা তুলে ধরেছে। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে, এই প্রবৃদ্ধি পরবর্তী প্রান্তিকগুলোতেও বজায় থাকে কি না এবং মূল ব্যবসা থেকে আয় কতটা শক্তিশালী হয়।

বিশেষ করে আমানত ও ধার করা অর্থের সুদ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নিট সুদ আয় বাড়ানো, বিনিয়োগ থেকে আয় ধরে রাখা এবং খেলাপি ঋণের অনুপাত কমানোর ধারাবাহিকতা ভবিষ্যৎ ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের মুনাফা ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ২০৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিনিয়োগ থেকে বাড়তি আয় এবং পরিচালন আয়ের প্রবৃদ্ধি এই সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে। তবে সুদ ব্যয় বৃদ্ধি ও নিট সুদ আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে মুনাফার প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই হয়, তা নির্ভর করবে আয় বৃদ্ধির উৎস, অর্থায়ন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণমান বজায় রাখার সক্ষমতার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com