জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই মামলায় কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে চার আসামির অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করারও আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। মামলার চার আসামিই পলাতক বলে আদালতের কার্যক্রমসংক্রান্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং কুষ্টিয়ায় ছাত্র-জনতার মৃত্যুর ঘটনায় দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ মামলার রায়কে গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে রায়ের পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ, আইনি ব্যাখ্যা এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়গুলোও এ ঘটনার সামগ্রিক মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে মোট তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। অভিযোগগুলোর মূল বিষয় ছিল আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্যে সমর্থন, আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগের নির্দেশনা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংসতা চালানো হয় এবং একপর্যায়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি হয়েছে।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৫, ১৭ ও ৩০ জুলাই আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে উপস্থিত থেকে তাঁর উসকানিমূলক বক্তব্যকে সমর্থন করেছিলেন মাহবুব উল আলম হানিফ। একই অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা এবং সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল বলে প্রসিকিউশন দাবি করে।
দ্বিতীয় অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি সভা। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, হানিফের নির্দেশে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই ওই সভায় সদর উদ্দিন খান, আসগর আলী, আতাউর রহমানসহ আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা অংশ নেন। সেখানে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের জন্য দলীয় কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রসিকিউশন দাবি করে। এ অভিযোগে চার আসামির ভূমিকা ও তাঁদের মধ্যকার নির্দেশনা-সংক্রান্ত সম্পর্ক বিচারিক বিবেচনায় আসে।
তৃতীয় অভিযোগটি ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ এবং প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, চার আসামির নির্দেশে আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসংগঠনের কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালান। ওই দিনের গুলিতে ছয়জন নিহত হন বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, বাবুল ফরাজী ও ইউসুফ শেখ। তাঁদের মৃত্যু ঘিরে দায় নির্ধারণ এবং সহিংসতার পেছনে নির্দেশদাতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা চিহ্নিত করা ছিল মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এই প্রাণহানির ঘটনা কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। আন্দোলনের সময় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর জন্য বিচারপ্রাপ্তির প্রশ্নটি কেবল আদালতের রায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বজন হারানোর বেদনা, ঘটনার পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহির প্রত্যাশা। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় এসব ঘটনার প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অভিযুক্তদের ভূমিকা আইনের নির্ধারিত মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে অভিযোগ, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং রায়ের যুক্তি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন।
প্রসিকিউশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ মামলার তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত সংস্থা চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে ৬ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলাটি আনুষ্ঠানিক বিচারপর্বে প্রবেশ করে এবং পরবর্তী সময়ে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর বিচারিক মূল্যায়ন এগিয়ে যায়।
২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ওই দিন থেকেই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত সাক্ষ্যগ্রহণ চলে এবং এ মামলায় মোট ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে উভয় পক্ষের বক্তব্য, উপস্থাপিত নথিপত্র এবং অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি বিচারিক বিবেচনায় নেওয়া হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর মামলায় প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ঘটনাপ্রবাহের সামঞ্জস্য, অভিযুক্তদের ভূমিকা এবং অন্যান্য প্রমাণের মূল্যায়ন রায় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মামলার যুক্তিতর্ক প্রথম দফায় ১০ জুন শেষ হয়। ওই দিন ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রাখেন। পরে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সাক্ষী ও নথিপত্র উপস্থাপন করা হয়। নতুন সাক্ষ্য ও নথির ওপর রাষ্ট্রপক্ষ এবং আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কও অনুষ্ঠিত হয়। ৭ অক্টোবর যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর মামলাটি আবার রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রাখা হয়। পরে গত মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-২ আদেশ দেন, বৃহস্পতিবার মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। নির্ধারিত দিনেই আদালত চার আসামির বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করেন।
হানিফকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ রায়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক। তবে সাজা কার্যকর, রায়ের বিরুদ্ধে আপিল কিংবা অন্যান্য আইনি প্রতিকারের বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান ও পরবর্তী আদালতীয় পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে। আসামিরা পলাতক থাকায় তাঁদের গ্রেপ্তার এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় পরবর্তী কার্যক্রমও এ মামলার অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় দায় নির্ধারণ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। এ ধরনের মামলায় একদিকে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা থাকে, অন্যদিকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ, নিরপেক্ষ বিচার এবং আইনি অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও অপরিহার্য। আদালতের রায় সেই বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। রায়ের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও আইনি পর্যালোচনা প্রকাশিত হলে অভিযোগগুলোর বিচারিক মূল্যায়ন এবং সাজা নির্ধারণের যুক্তি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যাবে।
সব মিলিয়ে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মাহবুব উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড এবং অপর তিন আসামির আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় কুষ্টিয়ায় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি। ছয়জনের প্রাণহানির অভিযোগ, রাজনৈতিক বক্তব্যের ভূমিকা, আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগের নির্দেশনা এবং দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম—সব মিলিয়ে মামলাটি জাতীয় পর্যায়ে তাৎপর্যপূর্ণ। এখন পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ, আসামিদের অবস্থান এবং রায়ের পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণের দিকে নজর থাকবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত