২০২৭ সালের নভেম্বরে তিস্তা মহাপরিকল্পনের উদ্বোধন

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১১ বার
২০২৭ সালের নভেম্বরে তিস্তা মহাপরিকল্পনের উদ্বোধন

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, নদীভাঙন, বন্যা, জলাবদ্ধতা ও কৃষিনির্ভর জীবনের নানা সংকট মোকাবিলায় বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে আরও এক ধাপ অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। তিনি জানিয়েছেন, সব প্রক্রিয়া শেষ হলে ২০২৭ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর নিষ্কাশন খাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা জানান। একই সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাই, কারিগরি পরামর্শ, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরিসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তিস্তা নদীকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্ষায় নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ে, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলে। নদীর গতিপথ, পলি জমা, ভাঙন, জলাবদ্ধতা এবং সেচব্যবস্থার সমস্যাও এই অঞ্চলের মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। এসব সংকটকে সমন্বিতভাবে মোকাবিলার লক্ষ্যেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, তিস্তা ইস্যু নিয়ে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। নদী ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে নদী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কারিগরি কমিটিও কাজ করছে। প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন মোকাবিলা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের বিষয়গুলোও যুক্ত থাকবে। ফলে প্রকল্পটির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ হওয়ার পর প্রকল্পের অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। অর্থমন্ত্রী দেশে ফেরার পর এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনার কথাও তিনি জানিয়েছেন। এরপর প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ আরও এগিয়ে যাবে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো বড় ও জটিল একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ মতামত বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সিইজিআইএস, নদী কমিশনের কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি চীন, নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়ার বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেও পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের এসব পরামর্শের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা বা ডিপিপি তৈরি করা হবে। প্রকল্পের কোন অংশ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হলে স্থানীয় জনগণ সবচেয়ে বেশি সুফল পাবেন, তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে ডিপিপি তৈরিতে আরও আট থেকে নয় মাস সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

এতে বোঝা যায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে সরকার প্রকল্পটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক নিয়ে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করতে চাইছে। নদী ব্যবস্থাপনার মতো দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রকল্পে ভুল পরিকল্পনার কারণে ভবিষ্যতে যাতে নতুন কোনো সমস্যা তৈরি না হয়, সে বিষয়টিও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও রংপুর—এই পাঁচ জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রকল্পটির সুফল পাবেন। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমানোর পাশাপাশি কৃষি, সেচ, যোগাযোগ, পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

তবে এত বড় একটি প্রকল্পের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে এর পরিকল্পনা, অর্থায়ন, পরিবেশগত ভারসাম্য, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ডিপিপি তৈরির উদ্যোগ সেই বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রাখারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রকল্পের মাধ্যমে নদী ও মানুষের সম্পর্ককে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, সেটিও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তিস্তা নদীকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা শুধু বন্যা বা ভাঙন থেকে সুরক্ষা পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষকরা চান নিয়মিত ও পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা, নদীতীরের মানুষ চান ভাঙন ও বন্যার ঝুঁকি থেকে নিরাপদ বসতি, আর স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষ চান নদীকেন্দ্রিক উন্নয়নের নতুন সুযোগ। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে ঘিরে এই অঞ্চলের মানুষের আগ্রহ দীর্ঘদিনের।

লালমনিরহাটে মহেন্দ্রনগর নিষ্কাশন খাল পরিদর্শনের সময়ও স্থানীয় পর্যায়ে পানি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব উঠে আসে। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী লালমনিরহাটে আসবেন এবং তার মাধ্যমে মহেন্দ্রনগরের দৃষ্টিনন্দন নিষ্কাশন খালের উদ্বোধন করা হবে। এই খাল চালু হলে এলাকার কয়েক হাজার মানুষ সরাসরি সেচ সুবিধা পাবেন বলে তিনি জানান।

খালটির দুই পাশে বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তার মতে, পানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সবুজায়নের উদ্যোগ স্থানীয় পরিবেশ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের প্রকল্প স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কৃষিকাজে সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলেও আশা করা হচ্ছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের সম্ভাব্য সময় হিসেবে ২০২৭ সালের নভেম্বরের কথা জানানোয় উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশায় নতুন করে গতি এসেছে। তবে উদ্বোধনের আগে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, কারিগরি পরিকল্পনা, বিশেষজ্ঞদের মতামত, ডিপিপি প্রস্তুত, অনুমোদন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

সরকারের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো পরিকল্পনাটিকে বাস্তবসম্মত, পরিবেশবান্ধব ও জনকল্যাণমুখী করে চূড়ান্ত করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়া। কারণ তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি অবকাঠামোগত উদ্যোগ নয়; উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন, কৃষি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সঙ্গে এর প্রত্যাশা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যদি পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তিস্তা অববাহিকার মানুষের জীবনযাত্রায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে নদী ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও নতুনভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এখন তাই মানুষের নজর আগামী কয়েক মাসের কারিগরি ও প্রশাসনিক অগ্রগতি এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৭ সালের নভেম্বরের ঘোষিত উদ্বোধনের দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com