সচিবালয় স্থানান্তরের প্রতিবাদে সড়কে শেকৃবি শিক্ষার্থীরা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১১ বার
সচিবালয় স্থানান্তরের প্রতিবাদে সড়কে শেকৃবি শিক্ষার্থীরা
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) কয়েক শ শিক্ষার্থী। বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সামনের বেগম রোকেয়া সরণিতে তাঁরা অবস্থান নিয়ে এই কর্মসূচি পালন করেন। শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, ওই মাঠে সচিবালয় স্থাপন করা হলে এলাকার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিক্ষাকার্যক্রমের জন্য মাঠটির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এর মালিকানা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সকাল থেকেই এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৎপরতা দেখা যায়। সকাল ১০টা থেকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে জড়ো হতে শুরু করেন। পরে তাঁরা দলবদ্ধভাবে আগারগাঁওয়ের নির্ধারিত এলাকায় গিয়ে সড়কে অবস্থান নেন। সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিজেদের আপত্তি জানাতে বিভিন্ন স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের স্লোগানের মধ্যে ছিল, ‘সচিবালয় স্থানান্তর মানি না, মানবো না’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’ এবং ‘টেক ব্যাক, টেক ব্যাক’। মাঠটি রক্ষা এবং নিজেদের দাবি আদায়ের প্রত্যয় থেকেই তাঁরা এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বলে জানান।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে পরিবেশ রক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গার ব্যবহার এবং গবেষণার সুযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। কৃষি শিক্ষার সঙ্গে মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও ব্যবহারিক গবেষণার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। এ কারণে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন প্রশাসনিক স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগকে তাঁরা নিজেদের শিক্ষা ও গবেষণার স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, কোনো স্থানের ব্যবহার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় এলাকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বিবেচনা করা উচিত।

অবরোধে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ৮২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাফিউর রহমান রোহান বলেন, তাঁরা চান না, সচিবালয় ওই এলাকায় স্থানান্তরিত হোক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে সচিবালয় স্থাপন করা হলে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের এই উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশ, জনপরিসর এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখা হবে।

আবির নামের আরেক শিক্ষার্থী মাঠটির মালিকানা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ নেই এবং এই মাঠটি আগে তাঁদের ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাঁর বক্তব্য, মাঠটির মালিকানা বিশ্ববিদ্যালয়কে ফিরিয়ে দেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানো সম্ভব হবে। শিক্ষার্থীদের এই দাবি থেকে বোঝা যায়, তাঁদের আপত্তি শুধু সচিবালয় স্থানান্তরের বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ নয়; মাঠটির ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়েও তাঁদের নির্দিষ্ট প্রত্যাশা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও আন্দোলনকারীদের অবস্থান সম্পর্কে অবগত রয়েছে। শেকৃবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা নিজেদের দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন। তবে তাঁরা কথা দিয়েছেন, কোনো ধরনের সহিংস আচরণ বা ভাঙচুরের মতো কর্মকাণ্ডে জড়াবেন না। কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্য আন্দোলনটি শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালনার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দেওয়া অঙ্গীকারের কথা সামনে এনেছে। জনসাধারণের চলাচল ব্যাহত না করে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে দাবি তুলে ধরার বিষয়টি এ ধরনের কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ।

আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সয়েল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা জড়ো হওয়ার সময় তিনি তাঁদের উদ্দেশে বলেন, তাঁরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তাঁর বক্তব্যে এলাকার পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বোঝানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও যুক্তিনির্ভর মতবিনিময়ের পথ খোলা রাখার কথাও উঠে এসেছে।

পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়ে শেকৃবির শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ অবশ্য নতুন নয়। এর আগে কয়েক দিন ধরে তাঁরা এ বিষয়ে আন্দোলন করে আসছিলেন। বুধবার সকালে মাঠে দুটি মেলার নির্মাণাধীন স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করে ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে নেয়। ওই ঘটনার পর বৃহস্পতিবারের সড়ক অবরোধ কর্মসূচি আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে সামনে আসে। আগের দিনের ভাঙচুরের ঘটনা আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করলেও বৃহস্পতিবারের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর জানিয়েছেন।

এ ধরনের বিরোধে প্রশাসনিক পরিকল্পনা, জনস্বার্থ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় করা জরুরি। সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রশাসনিক কেন্দ্র কোথায় স্থাপন করা হবে, সে সিদ্ধান্তের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং নগর পরিকল্পনার বিষয়গুলো যুক্ত থাকে। অন্যদিকে কোনো এলাকার উন্মুক্ত স্থান বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মাঠের ব্যবহার পরিবর্তন হলে পরিবেশ, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা এবং শিক্ষা ও গবেষণার ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা মূল্যায়ন করাও প্রয়োজন। এ কারণে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের বিষয়গুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা এবং সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি জনসমক্ষে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ।

শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক এলাকা। এখানে নতুন সরকারি স্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তার প্রভাব কেবল নির্ধারিত জমির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আশপাশের সড়কে যানবাহনের চাপ, নিরাপত্তাব্যবস্থা, জনসাধারণের চলাচল এবং উন্মুক্ত স্থানের ব্যবহারেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এসব প্রভাবের প্রকৃতি ও মাত্রা নির্ধারণ করতে হলে পরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য, জমির বর্তমান অবস্থা, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা জানালেও সেই আশঙ্কার পরিমাণ নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সুযোগের প্রশ্নটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমে ব্যবহারিক শিক্ষা, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রয়োজনীয় জায়গার অভাব থাকলে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক কাজ ও গবেষণার পরিসর সংকুচিত হতে পারে। এ কারণে মাঠটির বর্তমান মালিকানা, ব্যবহারসংক্রান্ত অধিকার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হলে বিতর্কের বিভিন্ন দিক পরিষ্কার হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথও খুঁজে দেখা যেতে পারে।

সড়ক অবরোধের কারণে বেগম রোকেয়া সরণি দিয়ে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চলাচলে বিঘ্নের আশঙ্কা থাকে। রাজধানীর ব্যস্ত এলাকায় এমন কর্মসূচিতে যাত্রী, কর্মজীবী মানুষ এবং জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারীরা ভোগান্তিতে পড়তে পারেন। তাই আন্দোলনকারীদের দাবি তুলে ধরার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি জনসাধারণের চলাচল ও নিরাপত্তার বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি, আলোচনার সুযোগ এবং প্রশাসনিক উদ্যোগ—এই তিনটি বিষয় সমন্বিতভাবে এগোলে বিরোধ নিরসনের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে শেকৃবির শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন পরিবেশ সংরক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং সরকারি অবকাঠামো পরিকল্পনা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীরা মাঠটির মালিকানা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন এবং সচিবালয় স্থানান্তরের সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা, পরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য এবং শিক্ষার্থী-প্রশাসনের আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে এ বিরোধ কোন পথে এগোয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com