স্টার্কের বিধ্বংসী স্পেল, ৩২৯ রানে অলআউট দক্ষিণ আফ্রিকা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
স্টার্কের বিধ্বংসী স্পেল, ৩২৯ রানে অলআউট দক্ষিণ আফ্রিকা

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
 ব্যাট হাতে দুর্দান্ত সূচনা, এরপর একের পর এক উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়—কেপটাউন টেস্টের প্রথম দিনে এমন নাটকীয় দৃশ্যেরই সাক্ষী হলো ক্রিকেটপ্রেমীরা। স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা যখন বড় সংগ্রহের স্বপ্ন দেখছিল, তখন অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ বাঁহাতি পেসার মিচেল স্টার্কের বিধ্বংসী বোলিংয়ে মুহূর্তেই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। মাত্র ছয় বলের ব্যবধানে চারটি উইকেট তুলে নিয়ে প্রোটিয়াদের ইনিংসের শেষভাগে ধস নামান তিনি। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ইনিংস থামে ৩২৯ রানে।

সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় টেস্টের প্রথম দিনে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিংয়ের দুই বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। দিনের প্রথম ভাগে স্বাগতিকদের ব্যাটাররা অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেন। কিন্তু মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে একপর্যায়ে চাপে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা। পরে ডেভিড বেডিংহাম ও মার্কো ইয়ানসেনের লড়াকু ব্যাটিং দলকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিলেও স্টার্কের শেষ মুহূর্তের আঘাতে সেই প্রতিরোধ আর দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

টেস্টের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকার দুই উদ্বোধনী ব্যাটার মার্কেস অ্যাকারম্যান ও এইডেন মার্করাম অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণকে বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামলান। দুজনের সাবলীল ব্যাটিংয়ে স্বাগতিকরা দ্রুত রানের গতি বাড়াতে সক্ষম হয়। উইকেটের সুবিধা কাজে লাগিয়ে তাঁরা অস্ট্রেলীয় বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।

মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে যাওয়ার আগে কোনো উইকেট না হারিয়ে ১৪০ রান তুলে নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। উদ্বোধনী জুটির এই পারফরম্যান্সে বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামা অ্যাকারম্যানের ব্যাটিং ছিল নজরকাড়া। আক্রমণাত্মক শট খেলে তিনি অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ওপর চাপ ধরে রাখেন।

অ্যাকারম্যান ৯৪ বলে ৯৫ রান করে সাজঘরে ফেরেন। নাথান লায়নের বলে স্টাম্পিংয়ের শিকার হওয়ার মধ্য দিয়ে ভাঙে দক্ষিণ আফ্রিকার শক্তিশালী উদ্বোধনী জুটি। মাত্র পাঁচ রানের জন্য সেঞ্চুরি থেকে বঞ্চিত হন তিনি। তবে তাঁর ইনিংস দলকে যে শক্ত ভিত এনে দিয়েছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

অন্য প্রান্তে মার্করামও ছিলেন বেশ আত্মবিশ্বাসী। অ্যাকারম্যানের বিদায়ের পর তিনিও নিজের ইনিংসকে বড় করার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত জশ হ্যাজলউডের বলে আউট হওয়ার আগে ৭৮ রান করেন এই ব্যাটার। দুই ওপেনারের বিদায়ের পর দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসে ধীরে ধীরে চাপ বাড়তে থাকে।

উদ্বোধনী জুটি ভাঙার পর দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিংয়ে যে ধস নামে, তা প্রথম দিনের ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেয়। অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা লাইন ও লেংথে ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে এনে ব্যাটারদের ভুল করতে বাধ্য করেন। একপর্যায়ে মাত্র ৭৪ রানের ব্যবধানে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে স্বাগতিক দল।

দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক টেম্বা বাভুমার জন্য দিনটি ছিল হতাশার। কোনো রান না করেই বিদায় নিতে হয় তাঁকে। অধিনায়কের এমন দ্রুত বিদায় দলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। এরপরও মধ্যক্রমের ব্যাটাররা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন, কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়তে থাকায় বড় জুটি গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে ডেভিড বেডিংহাম দলের হাল ধরার চেষ্টা করেন। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৫০ রান। অন্যদিকে মার্কো ইয়ানসেনও ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি করেন ৫২ রান। দুজনের দায়িত্বশীল ব্যাটিং দক্ষিণ আফ্রিকাকে দ্রুত অলআউট হওয়ার ঝুঁকি থেকে কিছুটা রক্ষা করে।

বিশেষ করে সপ্তম উইকেটে বেডিংহাম ও ইয়ানসেনের ৯৫ রানের জুটি স্বাগতিকদের ইনিংসে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। এই জুটি গড়ে ওঠার সময় অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের সামনে আবারও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা তখন ৩৫০ রানের কাছাকাছি কিংবা তার বেশি সংগ্রহ গড়ার সম্ভাবনা ধরে রাখার চেষ্টা করছিল।

কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে একটি ভালো জুটি যেমন ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে, তেমনি শেষ দিকে দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারানোও পুরো দিনের অর্জনকে ম্লান করে দিতে পারে। কেপটাউনে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে।

দিনের শেষভাগে নতুন বল হাতে নিয়ে মিচেল স্টার্ক যে তাণ্ডব চালিয়েছেন, সেটিই হয়ে ওঠে প্রথম দিনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। তাঁর গতি, নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাটারদের দুর্বলতা কাজে লাগানোর দক্ষতায় দক্ষিণ আফ্রিকার লেজের দিকের ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে পড়ে।

স্টার্কের আক্রমণের প্রথম শিকার হন রায়ান রিকেলটন। নতুন বলের চতুর্থ ডেলিভারিতে তাঁকে এলবিডব্লুর ফাঁদে ফেলেন অস্ট্রেলিয়ার এই পেসার। এরপর মাত্র দুই বলের ব্যবধানে মার্কো ইয়ানসেনকে বোল্ড করে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিরোধে বড় আঘাত হানেন তিনি।

এরপরও থামেননি স্টার্ক। নিজের পরের ওভারের প্রথম বলে জেরাল্ড কোয়েটজিকে ফিরিয়ে দেন। একই ওভারের তৃতীয় বলে কাগিসো রাবাদাকে এলবিডব্লুর ফাঁদে ফেলে দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসের সমাপ্তি টানেন তিনি।

অর্থাৎ, মাত্র ছয়টি বলের ব্যবধানে চারটি উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কার্যত অস্ট্রেলিয়ার হাতে এনে দেন স্টার্ক। এমন দ্রুত উইকেট পতন দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। যে দলটি দিনের শুরুতে বিনা উইকেটে ১৪০ রান তুলেছিল, তারাই শেষ পর্যন্ত ৩২৯ রানে থেমে যায়।

স্টার্কের বোলিংয়ের এই ঝলক আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, টেস্ট ক্রিকেটে নতুন বলের সঠিক ব্যবহার কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাটাররা যখন ইনিংসের শেষ দিকে বড় সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছিলেন, তখন ধারাবাহিক আক্রমণে তাঁদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দেন তিনি।

অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যাবর্তনে স্টার্ক সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখলেও অন্য বোলারদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নাথান লায়ন দুটি উইকেট তুলে নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসের মাঝপথে চাপ তৈরি করেন। তাঁর বলে অ্যাকারম্যানের স্টাম্পিংয়ের শিকার হওয়া ছিল ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। জশ হ্যাজলউডও মার্করামকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে স্বস্তি দেন। এ ছাড়া তরুণ বোলার কুপার কনোলি একটি উইকেট শিকার করেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের ম্যাচ-পর্যালোচনা এবং প্রকাশিত স্কোরকার্ডেও অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণের সম্মিলিত অবদানের বিষয়টি উঠে এসেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার এই তৃতীয় টেস্টের গুরুত্ব শুধু একটি ম্যাচের জয়-পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সিরিজের প্রথম দুই টেস্ট শেষে দুই দলই একটি করে জয় পেয়েছিল। ফলে কেপটাউনের এই ম্যাচটি সিরিজের ভাগ্য নির্ধারণের পাশাপাশি টেস্ট ক্রিকেটে দুই দলের অবস্থান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দিনের শুরুতে টস জিতে অস্ট্রেলিয়া প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী জুটি যখন ১৫৮ রান তুলে ফেলে, তখন অস্ট্রেলিয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বোলাররা ঘুরে দাঁড়ান। বিশেষ করে শর্ট বলের কৌশল কাজে লাগিয়ে স্বাগতিকদের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারকে চাপে ফেলেন তাঁরা। পরে দ্বিতীয় নতুন বল হাতে স্টার্কের বিধ্বংসী স্পেল সেই প্রত্যাবর্তনকে পূর্ণতা দেয়।

তবে ৩২৯ রানকে একেবারে ছোট সংগ্রহ বলার সুযোগ নেই। কেপটাউনের উইকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটাররা দিনের বড় একটি অংশে ভালো ব্যাটিং করেছেন। তাই অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাট হাতে দায়িত্বশীল পারফরম্যান্স দেখানো। প্রথম ইনিংসে দ্রুত উইকেট হারালে স্টার্কের অসাধারণ বোলিংয়ের সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

প্রকাশিত ম্যাচ-তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দিন শেষে অস্ট্রেলিয়া ব্যাটিং শুরু করার অপেক্ষায় ছিল। দ্বিতীয় দিনের শুরুতে তাদের লক্ষ্য থাকবে দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহের কাছাকাছি পৌঁছানো এবং সম্ভব হলে প্রথম ইনিংসে লিড নেওয়া। অন্যদিকে স্বাগতিকদের বোলাররা চাইবেন দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে।

সব মিলিয়ে কেপটাউনের প্রথম দিনটি ছিল দুই দলের পাল্টাপাল্টি আধিপত্যের এক নাটকীয় অধ্যায়। সকালে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটারদের দাপট, মাঝের সেশনে অস্ট্রেলিয়ার ঘুরে দাঁড়ানো এবং দিনের শেষভাগে স্টার্কের ছয় বলের অবিশ্বাস্য আঘাত—সব মিলিয়ে টেস্টটি পেয়েছে রোমাঞ্চকর মাত্রা। তবে প্রথম দিনের সাফল্য শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জয়ে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে পরবর্তী দিনগুলোতে দুই দলের ব্যাটিং ও বোলিংয়ের ধারাবাহিকতার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com