কক্সবাজারের উখিয়ার পর্যটন এলাকা ইনানীতে ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বেরিয়ে আগুন জ্বলার ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। আগুনের উৎস থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জারি করা হয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে বলে প্রশাসনের আদেশে জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, একটি বাড়িতে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলাকালে মাটির গভীর থেকে গ্যাস বেরিয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়। ভূগর্ভে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আগুনের প্রকৃত উৎস, গ্যাসের ধরন এবং এর বিস্তৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে কারিগরি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। এ অবস্থায় কৌতূহলবশত ঘটনাস্থলে ভিড় না করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছে প্রশাসন।
উপজেলা প্রশাসনের আদেশ অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন একটি বাড়িতে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। এ সময় মাটির প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পাইপ প্রবেশ করানোর পর্যায়ে ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বেরিয়ে আসে এবং আগুনের সূত্রপাত ঘটে। অপ্রত্যাশিত এ ঘটনায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়।
ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। তবে ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বেরিয়ে আসার ঘটনা হওয়ায় শুধু আগুন নেভানোই যথেষ্ট নয়; গ্যাসের প্রবাহ, সম্ভাব্য মজুত এবং আশপাশের পরিবেশের ওপর এর প্রভাবও পর্যবেক্ষণ করা জরুরি হয়ে পড়ে। এ কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান ও উৎপাদন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) একটি কারিগরি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তাদের পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল ভূগর্ভে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা এবং পরিস্থিতির প্রকৃতি সম্পর্কে কারিগরি ধারণা পাওয়া।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার স্বাক্ষরিত আদেশটি জারি করা হয় বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর। এতে বলা হয়, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগুনের উৎস থেকে আনুমানিক ২০০ মিটারের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ থাকবে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল ও আশপাশে এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যাতে আগুনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আগুনের উৎস ও আশপাশের এলাকাকে বিভিন্ন নিরাপত্তা জোনে ভাগ করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনাস্থলকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় নিয়ে মানুষের চলাচল সীমিত করা এবং আগুনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের নির্দেশনায় ঘটনাস্থল ও আশপাশে আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দিয়াশলাই কিংবা লাইটার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হতে পারে—এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কারণ, ভূগর্ভ থেকে গ্যাস নির্গত হওয়ার পরিস্থিতিতে সামান্য আগুন বা স্ফুলিঙ্গও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নির্ধারিত নিরাপত্তা এলাকার মধ্যে এসব কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের কারিগরি পর্যবেক্ষণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাস্থলে অপ্রয়োজনীয় মানুষের উপস্থিতি পরিস্থিতি মোকাবিলার কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ফায়ার সার্ভিস, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কারিগরি দলের সদস্যদের কাজের জন্যও নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ প্রয়োজন। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক এবং আশপাশ দিয়ে চলাচলকারী সবাইকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে আগুনের দৃশ্য দেখতে কৌতূহলবশত ঘটনাস্থলের কাছে ভিড় করা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
ইনানী কক্সবাজারের পরিচিত পর্যটন এলাকাগুলোর একটি। এ কারণে সেখানে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে ভূগর্ভ থেকে গ্যাস নির্গমন ও আগুন জ্বলার মতো ঘটনায় কৌতূহলের চেয়ে নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নির্ধারিত ২০০ মিটারের নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করলে ব্যক্তি নিজেই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে উদ্ধার ও কারিগরি কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মীদের কাজও ব্যাহত হতে পারে।
ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি কোনো পরিকল্পিত গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের সময় ঘটেনি; বরং একটি বাড়িতে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলাকালে ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বেরিয়ে আসে। প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পাইপ প্রবেশ করানোর সময় এমন ঘটনা ঘটায় ভূগর্ভস্থ স্তর ও গ্যাসের সম্ভাব্য উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে শুধু গ্যাস বেরিয়ে আগুন জ্বলার ঘটনা থেকেই সেখানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে ভূতাত্ত্বিক ও কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
ভূগর্ভস্থ গ্যাসের উপস্থিতি, নির্গমনের চাপ, গ্যাসের গঠন এবং তা কতক্ষণ ধরে বের হচ্ছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে ঝুঁকির প্রকৃতি নির্ধারণ করতে হয়। একই সঙ্গে গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের উপায় এবং আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনুমাননির্ভর তথ্য ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও কারিগরি পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করাই যুক্তিযুক্ত।
স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও এ ঘটনা সতর্ক হওয়ার একটি কারণ। নলকূপ স্থাপন, গভীর খনন কিংবা ভূগর্ভে পাইপ প্রবেশ করানোর মতো কাজের সময় অস্বাভাবিক গ্যাস নির্গমন, আগুন বা অন্য কোনো বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত কাজ বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো জরুরি। নিজেরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করা কিংবা গ্যাসের উৎস পরীক্ষা করতে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রবেশ করা উচিত নয়। বিশেষ করে আগুনের কাছাকাছি ধূমপান, রান্না বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মতো কাজ এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
প্রশাসনের ১৪৪ ধারা জারির সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের অবাধ চলাচল বন্ধ রেখে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়ানো। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়; এটি জরুরি পরিস্থিতিতে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। ফলে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের উচিত নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাজে সহযোগিতা করা।
ইনানীর এই ঘটনা ভূগর্ভস্থ সম্পদ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো আগুনের উৎস ও গ্যাস নির্গমনের প্রকৃতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা। বাপেক্সের কারিগরি পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ ঘোষণা না করা পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে দূরে থাকা এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলাই হবে সবার জন্য সবচেয়ে দায়িত্বশীল আচরণ। আগুনের উৎস থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে প্রবেশ ও অবস্থানের নিষেধাজ্ঞা অমান্য না করে স্থানীয়দের সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্যের অপেক্ষা করা প্রয়োজন, যাতে গুজব বা অনুমানের কারণে আতঙ্ক না ছড়ায়। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনাই এখন সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান লক্ষ্য।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত