সৌদি আরবের ছয় স্থাপনায় হামলার দাবি হুতিদের

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৩ বার
সৌদি আরবের ছয় স্থাপনায় হামলার দাবি হুতিদের
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও সামরিক সদর দপ্তর লক্ষ্য করে ছয়টি হামলা চালানোর দাবি করেছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল থেকে রাজধানী রিয়াদ এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান পর্যন্ত বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তবে এসব হামলার সব কটির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

হুতিদের এই দাবি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন সৌদি আরব ও ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তেহরানে বৈঠক করে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং সংলাপের মাধ্যমে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার সংঘাত নিরসনের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। বৈঠকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনার পর কূটনৈতিক পর্যায়ে ইতিবাচক বক্তব্য এলেও মাঠপর্যায়ে হামলা ও পাল্টা হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

হুতিদের বিবৃতি অনুযায়ী, ছয়টি হামলার মধ্যে রাস তানুরা তেল শোধনাগার ও আবকাইক এলাকায় সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠানোর দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। এ ছাড়া রাবিগ তেল শোধনাগার ও নাজরান অঞ্চলে সৌদি সামরিক বাহিনীর একটি সদর দপ্তরেও হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে তারা।

তবে হুতিদের বিবৃতিতে এসব স্থাপনায় হামলার দাবি করা হলেও সেগুলোতে প্রকৃতপক্ষে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষও হুতিদের ছয়টি হামলার দাবির সব বিষয়ে বিস্তারিত নিশ্চিত তথ্য দেয়নি। ফলে হামলার লক্ষ্যবস্তু ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে গোষ্ঠীটির বক্তব্যকে আপাতত দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

এর আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, হুতিদের ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রিয়াদের দিকে যাওয়ার সময় সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেগুলো শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে। সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ রাজধানীর একটি এলাকায় পড়ে। এতে এক সৌদি নাগরিক আহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি বাড়ি ও একটি গাড়ি। আহত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বেসামরিক স্থাপনা ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ার ঘটনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা গেলেও সেগুলোর অংশবিশেষ নিচে পড়ে ঘরবাড়ি, যানবাহন কিংবা মানুষের ক্ষতি করতে পারে। রিয়াদের সাম্প্রতিক ঘটনায় একজনের আহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ি ও গাড়ির ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সেই ঝুঁকিরই উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সামরিক লক্ষ্যবস্তুকে কেন্দ্র করে সংঘাত চললেও এর প্রভাব যে বেসামরিক মানুষের জীবনযাত্রায় পড়তে পারে, ঘটনাটি তা আবার সামনে এনেছে।

আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যেই নতুন হামলার দাবি পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। চলতি সপ্তাহের সোমবার (২৬ অক্টোবর) তেহরানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে সৌদি আরবের পক্ষে প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের পক্ষে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের পক্ষে গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন অংশ নেন। ইরানের পক্ষ থেকে বৈঠকটি আয়োজন করা হয়।

আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা কমানো, আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখা। বৈঠক শেষে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে সম্মত হয়। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যেও সামরিক উত্তেজনা ফিরে আসা ঠেকাতে আলোচনার পথ খোলার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। কিন্তু বৈঠকের কয়েক দিনের মধ্যেই হুতিদের নতুন হামলার দাবি কূটনৈতিক উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

হুতিদের দাবি অনুযায়ী, দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার ফলে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। তবে এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে রাস তানুরা, আবকাইক ও রাবিগের তেল স্থাপনাগুলোতে হামলার পর উৎপাদন, সরবরাহ কিংবা অবকাঠামোগত কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। এসব স্থাপনার প্রকৃত অবস্থা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।

সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো দেশটির অর্থনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। রাস তানুরা ও আবকাইকের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে তা শুধু সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে কোনো স্থাপনায় হামলার দাবি উঠলেই তেল উৎপাদন বা রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি ও কার্যক্রমের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অপেক্ষা করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, বিমানবন্দর ও সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের দাবি আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির জটিলতাও তুলে ধরছে। বিমানবন্দরগুলো বাণিজ্যিক ও যাত্রীবাহী বিমান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এসব স্থাপনার আশপাশে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে যাত্রী, বিমান সংস্থা, কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে সামরিক স্থাপনায় হামলার পাল্টাপাল্টি দাবি সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে।

ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের মধ্যকার সংঘাত দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সঙ্গে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব শুধু সীমান্তবর্তী এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না; মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দেয়।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে একদিকে তেহরানে আঞ্চলিক দেশগুলোর কূটনৈতিক আলোচনা, অন্যদিকে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার দাবি—দুটি বিপরীতধর্মী প্রবণতা পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চললেও বাস্তব পরিস্থিতিতে সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলে সেই উদ্যোগের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, হামলার বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সময় জনবসতিপূর্ণ এলাকায় সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে। রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজনের আহত হওয়া এবং বাড়ি ও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা দেখিয়েছে, সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে যেতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে জরুরি সতর্কবার্তা, দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা এবং বেসামরিক স্থাপনা সুরক্ষার ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

সব মিলিয়ে সৌদি আরবের ছয়টি স্থাপনায় হামলার বিষয়ে হুতিদের দাবি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে হামলার প্রকৃত ফলাফল, স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি এবং বিমান চলাচল বা তেল সরবরাহে কোনো প্রভাব পড়েছে কি না, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তেহরানের বৈঠকে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, নতুন এই দাবির পর তা কতটা এগোয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের। একই সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের মধ্যে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ সচল রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com