মাতারবাড়ী বন্দর নিয়ে স্বচ্ছতা চাইলেন শফিকুর রহমান

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
মাতারবাড়ী বন্দর নিয়ে স্বচ্ছতা চাইলেন শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে সরকারের অবস্থান ও সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, এই বন্দর নিয়ে কোনো ধরনের লুকোচুরি হচ্ছে কি না, তা দেশের মানুষ জানতে চায়। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো অস্পষ্টতা গ্রহণযোগ্য নয় উল্লেখ করে তিনি সরকারের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ সফরের উদ্দেশ্য ও অর্জন জাতির সামনে পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন।

শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ১১-দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে খুলনা বিভাগ অভিমুখী লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। সমাবেশে তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার এবং দুর্নীতি ও দখলদারত্ব বন্ধের দাবিও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চার দিনের সফরের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, প্রধানমন্ত্রী কী উদ্দেশ্যে বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে কী অর্জন করে ফিরেছেন, তা জনগণের সামনে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো গোপন সমঝোতা বা অস্পষ্টতা রয়েছে কি না, তা পরিষ্কার করতে হবে। কানেকটিভিটির নামে বাংলাদেশকে কোনো পক্ষের কাছে ইজারা দেওয়া চলবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো প্রকল্প। এ ধরনের বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে এবং শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে বন্দরকেন্দ্রিক যোগাযোগ, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়গুলো জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে প্রকল্পটির পরিকল্পনা, পরিচালনা, বিদেশি অংশীদারত্ব এবং সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন—শফিকুর রহমানের বক্তব্যে সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।

তবে মাতারবাড়ী বন্দর নিয়ে কোনো গোপন সমঝোতা হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ বা নির্দিষ্ট তথ্য তিনি বক্তব্যে উপস্থাপন করেননি। তাঁর বক্তব্য মূলত সরকারের কাছে ব্যাখ্যা ও স্বচ্ছতা দাবি। তাই অভিযোগ বা আশঙ্কাকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা না করে সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট চুক্তি এবং প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হলে সরকারকে তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে সেই উদ্বেগ দূর করতে হয়।

সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেন, অতীতে যারা দাসত্ব স্বীকার করেছিল, তাদের পরিণতি এখন ভোগ করতে হচ্ছে। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে কেউ পার পাবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের মতামত এবং দেশের স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সে বিষয়ে তিনি রাজনৈতিক ও জনসচেতনতার আহ্বান জানান।

এদিনের লংমার্চের আরেকটি প্রধান লক্ষ্য ছিল গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি সামনে আনা। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তাঁদের সাত দফা দাবির মধ্যে মূল দাবি হলো গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন। তাঁর মতে, এই দাবি বাস্তবায়িত হলে বাকি ছয় দফার অনেক সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হতো। তিনি অভিযোগ করেন, দেশে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব, দুর্নীতি ও মাদক কারবারের মতো সমস্যা অব্যাহত রয়েছে। এসব অনিয়ম বন্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বিএনপির সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, দলটি জনগণকে হতাশ করেছে এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। জাতীয় সংসদে গণভোটের রায় নিয়ে যে অবস্থান নেওয়া হয়েছে, তা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে রাজনৈতিকভাবে এর মূল্য দিতে হতে পারে বলে আগে সতর্ক করেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। আগামী ৯ নভেম্বর সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

১১-দলীয় ঐক্যের এই কর্মসূচিতে অন্যান্য নেতারাও সরকারের সমালোচনা করেন এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি জানান। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ অভিযোগ করেন, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে। সরকারি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের জমি দখলের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়কে দায়িত্ব নিতে হবে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সংবিধান সংস্কার না করা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশের রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সরকার বিভিন্নভাবে জনগণের রায়কে অসম্মান করছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও সাংবিধানিক পদে দলীয় নিয়োগের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমবে।

উদ্বোধনী সমাবেশে জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি এবি পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নেতারা বক্তব্য দেন। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন কিংবা দলটির অন্য কোনো নেতা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন না। ১১-দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতে এনসিপির অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আগে থেকেই আলোচনা ছিল। ফলে উদ্বোধনী সমাবেশে দলটির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি নতুন করে রাজনৈতিক কৌতূহল তৈরি করেছে।

শফিকুর রহমানের বক্তব্য শেষে সকাল সাড়ে আটটার দিকে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে লংমার্চের গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। প্রায় ৪২৫ কিলোমিটারের এই যাত্রায় ১৯টি জেলা অতিক্রম করার পরিকল্পনা রয়েছে। গাড়িবহরটি হানিফ ফ্লাইওভার হয়ে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক ধরে ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, খুলনা, রূপসা সেতু পার হয়ে যশোর ও কুষ্টিয়ার দিকে যাওয়ার কথা। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশ হওয়ার কথা রয়েছে।

আয়োজকদের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, নাওডোবা, বাগেরহাটের কাটাখালী, খুলনার বাবরী চত্বর ও স্বাধীনতা চত্বর, যশোরের মুড়লি মোড় এবং ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পথসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন জেলার মানুষের কাছে সাত দফা দাবি তুলে ধরতে চায় ১১-দলীয় ঐক্য। এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করেছিল এই রাজনৈতিক জোট। খুলনা বিভাগের পর আগামী ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখেও লংমার্চ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

১১-দলীয় ঐক্যের ঘোষিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার বিচার। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধের দাবিও রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে এ ধরনের লংমার্চ কেবল একটি যাত্রাপথের কর্মসূচি নয়; এটি বিভিন্ন অঞ্চলে জনমত সংগঠিত করা, দলের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন এবং সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির একটি পদ্ধতি। তবে কর্মসূচির প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে দাবিগুলোর পক্ষে কতটা জনসমর্থন তৈরি হয় এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে এগোয় কি না, তার ওপর।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে শফিকুর রহমানের প্রশ্নও এই কর্মসূচির রাজনৈতিক বার্তাকে আরও বিস্তৃত করেছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও সংশ্লিষ্ট চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ জনআস্থা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। লংমার্চের মাধ্যমে বিরোধী দলগুলো তাদের দাবি দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত এসব দাবির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে রাজনৈতিক সংলাপ, সংসদীয় প্রক্রিয়া এবং সরকারের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com