হুমকির ভয়ে বসতভিটা ছাড়লেন মানিক পশারীর বোন

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২ বার
হুমকির ভয়ে বসতভিটা ছাড়লেন মানিক পশারীর বোন

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পিরোজপুরে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভাইয়ের মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার পর হুমকির মুখে এলাকা ছেড়েছেন তাঁর বোন হেনা বেগম। স্বজনদের দাবি, নিরাপত্তাহীনতা ও নানা ধরনের হুমকি-ধমকির কারণে গত বুধবার তিনি নিজ বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এর আগে মানিক পশারীর আরও কয়েকজন নিকটাত্মীয়ও এলাকা ছেড়েছেন বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তবে হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করেছে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী। পুলিশ বলছে, এলাকায় বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।

পিরোজপুর সদর উপজেলার সংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর বাড়ি। বাড়ির পাশেই একটি ছোট ঝুপড়িঘরে বসবাস করতেন তাঁর বোন হেনা বেগম। ভাইয়ের মৃত্যুর পর দাফন নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনা এবং পরবর্তী পরিস্থিতিতে তিনিও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ভাইয়ের মরদেহ দাফনে যারা বাধা দিয়েছিল, তাদের বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলার পর থেকেই তাঁর ওপর চাপ ও হুমকি আসতে থাকে। শেষ পর্যন্ত আতঙ্কের মধ্যে পরিচিত এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

প্রয়াত মানিক পশারী ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং মুক্তিযুদ্ধের পরিচয়ের কারণে মৃত্যুর পর তাঁর দাফনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে মানিক পশারী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর জামাতার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেখানে দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর গত ২৪ অক্টোবর সকালে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর মরদেহ পিরোজপুরে নেওয়া হলে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দেয়। স্থানীয় কিছু ব্যক্তি তাঁর মরদেহ সেখানে দাফন না করার দাবি জানান বলে পরিবারের অভিযোগ।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ওই সময় পিরোজপুর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জামায়াতের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে ও সমবেত হতে দেখা যায় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। দাফন নিয়ে বিরোধের মধ্যে পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে পারিবারিক কবরস্থানে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। সে সময় পুলিশ পাহারায় ছিল বলে জানা গেছে।

দাফন সম্পন্ন হলেও পরিবারের উদ্বেগ কাটেনি। স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকে তাঁদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। বিশেষ করে হেনা বেগম গণমাধ্যমে কথা বলার পর তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। তিনি নিজেও জানিয়েছেন, রাতে ঝুপড়িঘরে একা থাকতে ভয় পান। ভাইয়ের দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় যাঁদের বিরুদ্ধে তিনি কথা বলেছেন, তাঁদের পক্ষ থেকে হুমকি আসছে বলে তাঁর অভিযোগ।

মোবাইল ফোনে হেনা বেগম জানিয়েছেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি এলাকা ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, রাতে নিজের ঘরে থাকতেও তিনি ভয় পাচ্ছেন। ভাইয়ের মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় যাঁরা জড়িত ছিলেন বলে তিনি মনে করেন, তাঁদের বিষয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পর থেকে নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়েছেন। এ পরিস্থিতিতে তিনি প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চাওয়ার কথাও জানিয়েছেন।

হেনা বেগমের এই অভিযোগের পাশাপাশি পরিবারের আরেক সদস্য পান্না পশারীও হুমকির কথা জানিয়েছেন। তিনি প্রয়াত মানিক পশারীর ভাই এবং বর্তমানে খুলনার বটিয়াঘাটায় বসবাস করেন। পান্না পশারীর অভিযোগ, ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে গত ২৪ অক্টোবর দুপুরে পিরোজপুরের পুরান বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গেলে তাঁকে হুমকি দিয়ে সেখান থেকে ফেরত পাঠানো হয়। জানাজা ও দাফনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও নিরাপত্তার আশঙ্কায় তাঁরা পিরোজপুর ছাড়তে বাধ্য হন বলে দাবি তাঁর।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাঁর শেষ বিদায়ের আয়োজন ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা তাঁদের জন্য গভীর কষ্ট ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৃত্যুর শোক সামলানোর পাশাপাশি তাঁদের নিরাপত্তা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবারের নারী সদস্যের এলাকা ছাড়ার ঘটনা তাঁদের আশঙ্কাকে আরও স্পষ্ট করেছে। স্বজনদের বক্তব্য, তাঁরা কোনো সংঘাত চান না; বরং নিরাপদে বসবাস এবং প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা চান।

তবে পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী। জিয়ানগর উপজেলা জামায়াতের আমির আলী হোসেন বলেছেন, তাঁদের দলের পক্ষ থেকে মানিক পশারীর কোনো স্বজনকে হুমকি দেওয়া হয়নি বা হয়রানি করা হয়নি। এ ধরনের অভিযোগ সত্য নয় বলেও দাবি করেন তিনি। ফলে হুমকির অভিযোগ এবং তা অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, মানিক পশারীর মরদেহ দাফনের পর এলাকায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তারপরও পুলিশ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এলাকার পরিবেশ শান্ত রয়েছে।

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে পরিস্থিতি শান্ত থাকার কথা বলা হলেও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে হেনা বেগমের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না এবং পরিবারের সদস্যরা নিরাপদে নিজ এলাকায় ফিরতে পারবেন কি না।

একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাঁর দাফনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, স্বজনদের হুমকির অভিযোগ এবং পরিবারের সদস্যদের এলাকা ছাড়ার ঘটনা স্থানীয় সমাজে উদ্বেগের বিষয়। একই সঙ্গে অভিযোগ অস্বীকার করা পক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা, অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যরা যেন ভয়ভীতি ছাড়া স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা দেওয়াই এখন স্থানীয় প্রশাসনের সামনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com