সর্বশেষ :

এবার এইচএসসিতে ২৩৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবাই ফেল

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩ বার
এবার এইচএসসিতে ২৩৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবাই ফেল

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে দেশের ২৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। এসব প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছেন। অন্যদিকে শতভাগ পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩৯টি। শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফলাফলে এই চিত্র উঠে এসেছে। সামগ্রিকভাবে এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ কম।

শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২টি। তার আগের বছর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৫। সেই হিসাবে দুই বছরের ব্যবধানে কোনো পরীক্ষার্থী পাস করেনি—এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩৯ হওয়ায় একই পরীক্ষার ফলাফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে।

এবারের ফলাফলে সামগ্রিক পাসের হার কমে যাওয়াও শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। ২০২৫ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এবার তা কমে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। এই পরিবর্তন শুধু পরীক্ষার্থীদের ফলাফলের হিসাব নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ পর্যালোচনারও প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

শনিবার বেলা ১১টায় সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ফলাফল প্রকাশের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পরপরই সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। অনলাইনেও একযোগে ফলাফল দেখার সুযোগ পান পরীক্ষার্থীরা। এর আগে ২৯ অক্টোবর ফল প্রকাশের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তারিখ পরিবর্তন করে ৩১ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়।

এ বছর নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১২ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নেওয়ার কথা ছিল। পরীক্ষা শুরু হয় ২ জুলাই। দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষায় বেশ কিছুসংখ্যক পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। ফলে মোট নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী এবং উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ ফলাফল বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

শূন্য পাস করা ২৩৯টি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। শিক্ষার্থীদের পূর্ববর্তী শিক্ষাগত প্রস্তুতি, নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ, শিক্ষকসংকট, পাঠদানের পরিবেশ, বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সক্ষমতা—বিভিন্ন বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে দুর্বল ফল দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর শিক্ষার পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখা জরুরি। শুধু ফলাফল প্রকাশের পর শূন্য পাসের সংখ্যা গণনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে পড়েছেন, নিয়মিত পাঠদান কতটা হয়েছে, পর্যাপ্ত শিক্ষক ছিলেন কি না এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

অন্যদিকে শতভাগ পাস করা ১৩৯টি প্রতিষ্ঠানও এবারের ফলাফলে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পেছনে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অধ্যয়ন, শিক্ষকদের আন্তরিকতা, অভিভাবকদের সহযোগিতা এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিবেশের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে শতভাগ পাসের ফলাফলকে শুধু সংখ্যার বিচারে মূল্যায়ন না করে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। ভালো ফলের পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য।

এবারের ফলাফল শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। যারা উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাঁদের সামনে এখন উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রস্তুতি নেওয়ার নতুন ধাপ। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য তাঁদের নিজ নিজ যোগ্যতা ও পছন্দ অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। অন্যদিকে যারা অকৃতকার্য হয়েছেন, তাঁদের জন্য সময়টি কঠিন হলেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলাফল খারাপ হওয়ায় হতাশ না হয়ে কোন বিষয়ে দুর্বলতা ছিল, তা চিহ্নিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীদের ফলাফল প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে পরিবারের সদস্যদের দায়িত্বশীল আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘ প্রস্তুতির পরও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের অন্যের সঙ্গে তুলনা করা বা মানসিক চাপে রাখা সমস্যাকে আরও বাড়াতে পারে। বরং শিক্ষার্থীর দুর্বলতা বুঝে সহযোগিতা করা, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া এবং নতুন করে প্রস্তুতির পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একটি পরীক্ষার ফলাফল কোনো শিক্ষার্থীর সম্পূর্ণ সক্ষমতা কিংবা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।

ফলাফল নিয়ে কোনো পরীক্ষার্থীর আপত্তি থাকলে উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষা বোর্ডগুলোর ঘোষিত তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে এ আবেদন গ্রহণ করা হবে। আবেদনপ্রক্রিয়া, ফি এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। তাই আগ্রহী পরীক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিয়ম মেনে আবেদন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক তথ্যের ওপর নির্ভর না করে বোর্ডের নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষাব্যবস্থার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। একদিকে পাসের হার কমেছে, অন্যদিকে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। পাশাপাশি শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও রয়েছে। এই বৈপরীত্যের কারণ অনুসন্ধান না করলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র বোঝা কঠিন হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ, দুর্বল প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং পাঠদানের মান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন জরুরি।

শিক্ষার্থীদের সাফল্য ও ব্যর্থতার পরিসংখ্যানের বাইরে প্রতিটি ফলাফলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ব্যক্তিগত স্বপ্ন, পরিবারের প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার আকাঙ্ক্ষা। তাই এবারের ফলাফলকে কেবল পাস-ফেলের হিসাব হিসেবে না দেখে শিক্ষার মান উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে এমন ফলাফলের পুনরাবৃত্তি কমানো সম্ভব হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com