প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপর সংঘটিত হামলার ঘটনায় অবশেষে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হলো অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এক সিদ্ধান্তে সিন্ডিকেট সভায় ৬৪ জন বর্তমান ছাত্রলীগ নেতাকে আজীবন বহিষ্কার এবং হামলার সময় ছাত্রত্ব শেষ হয়ে যাওয়া ৭৩ জন সাবেক নেতার সনদ স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভা শেষে দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে এক ব্রিফিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, গত বছরের জুলাই মাসে চলমান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শান্তিপূর্ণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপর যারা নৃশংসভাবে হামলা চালিয়েছিল, তাদের পরিচয়, সংশ্লিষ্টতা ও অপরাধের মাত্রা অনুসারে একাধিক পর্যায়ের তদন্ত ও যাচাই শেষে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
উপাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে চিহ্নিত মোট অভিযুক্তের সংখ্যা ছিল ২২৯ জন। এদের মধ্যে ১৩০ জন এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এবং ৯৯ জন ইতোমধ্যে পাস করে সনদপ্রাপ্ত বা স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। অধ্যয়নরত ১৩০ জনের মধ্যে ৬৪ জনকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি সহিংসতায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আরও ৩৭ জন শিক্ষার্থীকে দুই বছরের জন্য, ৮ জনকে এক বছরের জন্য এবং ১ জনকে ছয় মাসের জন্য সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। অপরদিকে, তদন্তে অপরাধের কোনো আলামত না পাওয়ায় ২০ জন শিক্ষার্থীকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
অপরদিকে, সাবেক ৯৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭৩ জনের সনদ চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়েছে। এরা সক্রিয়ভাবে হামলায় অংশ নিয়েছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী এমন অপরাধের জন্য সনদ বাতিল করা হয়। ৬ জনের সনদ দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে এবং ২০ জনকে নির্দোষ হিসেবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আরও বলেন, এই হামলার নেপথ্যে ছিল একটি সংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে মদদপুষ্ট চক্র, যারা বহিরাগত সন্ত্রাসীদেরও ব্যবহার করেছিল। তাদের অনেকেই ছিলেন ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মনে করে, এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ নয়—বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত হামলা, যার মাধ্যমে আন্দোলন দমন ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ক্যাম্পাসে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরাও এই ঘটনায় সঠিক নিয়ম না মেনে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয় আইনের পরিপন্থী। সেইসাথে যেসব বহিরাগত সন্ত্রাসী এই হামলায় অংশ নিয়েছিল এবং যারা পর্দার আড়ালে থেকে হামলার নকশা তৈরি করেছিল, তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুলাই মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদভিত্তিক কোটাবিরোধী ও বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের আয়োজনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। সেদিন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে হেলমেট পরা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা লাঠি, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের উপর সশস্ত্র হামলা চালায়। ওই হামলায় অন্তত ৩৫ জন আহত হন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষকও ছিলেন।
হামলার ঘটনার পরপরই ক্যাম্পাসজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন ও শিক্ষক সমিতির কঠোর অবস্থানের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রথমে অভিযুক্তদের সাময়িক বহিষ্কার এবং সনদ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর দীর্ঘ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষে এবার স্থায়ী বহিষ্কার ও সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলো।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী মহল এই সিদ্ধান্তকে ‘বিচারপ্রক্রিয়ার বিজয়’ হিসেবে দেখছে। অনেকেই বলছেন, এই রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল, যেখানে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয় বা সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে বিচার প্রভাবিত করা যায়নি।
তবে ছাত্রলীগের একটি অংশ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ‘পক্ষপাতমূলক’ ও ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ অভিযোগ তুলেছে। তাদের মতে, আন্দোলনের নামে যারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অচল করে রেখেছিল এবং ক্যাম্পাসের পরিবেশকে উত্তপ্ত করেছিল, তাদের দায়ও সমানভাবে তদন্ত করা উচিত ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, কোনো ধরনের আপিল প্রক্রিয়া থাকলেও এটি শুধুমাত্র প্রামাণ্য নতুন তথ্যের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে। আন্দোলনের এক ছাত্রনেতা বলেন, “এই সিদ্ধান্ত যেন পুনর্বিবেচনার নামে প্রত্যাহার করা না হয়। জাবি প্রমাণ করেছে, অন্যায়ের বিচার সম্ভব—শুধু প্রয়োজন হয় সত্যের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ।”
এই ঘটনার মাধ্যমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও, তা রেখে গেল একটি শক্তিশালী বার্তা: যে অপরাধই হোক না কেন, ছাত্ররাজনীতির নামে কারও হাতে আর সহিংসতার বৈধতা নেই।