কোটা পদ্ধতি ছিল দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির হাতিয়ার: ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে ড. ইউনূসের কড়া বার্তা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৫ আগস্ট, ২০২৫
  • ১০২ বার
১৫ নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি শেষের নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ‘ ২০২৫  | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস কোটা পদ্ধতি প্রসঙ্গে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন, যা ইতোমধ্যে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মঙ্গলবার ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে দেশব্যাপী আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “কোটা পদ্ধতি ছিল দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির এক নগ্ন হাতিয়ার, যার মাধ্যমে একটি অবৈধ সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিল।”

ড. ইউনূসের মতে, এই কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা এমন সব মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল, যাঁরা রাজনৈতিক আনুগত্য ছাড়া আর কোনো যোগ্যতা প্রদর্শন করেননি। তিনি বলেন, “যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নয়, বরং পরিবারতন্ত্র ও দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে দেশের ভবিষ্যৎ গড়া হচ্ছিল। এটি একটি জাতির জন্য আত্মঘাতী পথ। অথচ দেশের মেধাবী ও প্রতিভাবান তরুণদের জন্য ছিল হতাশা, বঞ্চনা ও প্রতারণার ছক।”

ভিডিও বার্তায় ড. ইউনূস অতীতের সেই রক্তাক্ত স্মৃতির কথাও তুলে ধরেন, যেখানে সরকার আন্দোলনরত তরুণ-তরুণীদের দমন করতে নির্মমতার পথ বেছে নেয়। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “মানুষের বুকে গুলি চালিয়ে একটি ফ্যাসিবাদী সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিল। রাজপথে দাঁড়িয়ে যারা কণ্ঠ উঁচু করেছিল, তাদের গুলি করে রক্তাক্ত করা হয়েছিল, যেন তারা আর কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।”

এই বক্তব্যে তিনি এক ভয়াবহ তথ্যও সামনে আনেন। বলেন, “গুলিবিদ্ধ আহতদের চিকিৎসা পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি। হাসপাতালগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন তাদের চিকিৎসা না দেওয়া হয়। এটা শুধু মানবতাবিরোধী কাজ নয়, এটা ছিল রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত রূপ।”

ড. ইউনূসের এই বক্তব্য শুধু একটি সরকারি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ নয়, বরং অনেকের দৃষ্টিতে এটি ছিল একটি নৈতিক চার্জশিট — যা অতীতের শাসনব্যবস্থার ফাঁকফোকর, নির্মমতা ও দুর্নীতির নগ্ন চিত্র একবারে স্পষ্ট করে তোলে। তাঁর ভাষায়, “রাষ্ট্র কখনও সহিংসতা, অন্যায় ও অপশাসনের পক্ষে থাকতে পারে না। যারা গুলি চালিয়েছে, যারা হাসপাতাল বন্ধ করে দিয়েছিল, যারা কোটা দিয়ে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চেয়েছিল—তাদের বিচার হবেই।”

এদিকে ড. ইউনূসের এ বক্তব্যের পর থেকে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষিত তরুণ সমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, এই বক্তব্যে অবশেষে সেই সত্য উচ্চারিত হলো, যেটি বহুদিন ধরে স্তব্ধ রাখা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু মানুষ জানিয়েছেন, তারা আন্দোলনের সময়কার এই নির্মমতা নিজের চোখে দেখেছেন কিংবা ভুক্তভোগী হয়েছেন।

যদিও ড. ইউনূস তাঁর বক্তব্যে কোনো নির্দিষ্ট সরকারের নাম উল্লেখ করেননি, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে স্পষ্টতই ২০২৪ সালের পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর নৈতিক অবস্থান বলে ব্যাখ্যা করছেন। অনেকে মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে এটি ছিল তাঁর পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধার যথার্থ মূল্যায়নের দাবি আরও জোরালো করবে।

অন্যদিকে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, ড. ইউনূসের বক্তব্যকে তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে এবং এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ড. ইউনূস তাঁর বক্তব্যে আগামী দিনের তরুণ প্রজন্মের প্রতি একটি বার্তাও রেখে যান—“আপনারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবেন না। একদিন এই দেশ মেধা, ন্যায্যতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে গড়ে উঠবে, যেখানে কোটা নয়, প্রাধান্য পাবে যোগ্যতা।”

তাঁর এই বক্তব্য কেবল একটি ভিডিও বার্তা নয়, বরং এক গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনার ইঙ্গিত দিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত