দেশত্যাগের শেষ ৪৫ মিনিট: ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে শেখ হাসিনার পালানোর অজানা গল্প

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৫ আগস্ট, ২০২৫
  • ৭৪ বার
সরকার নতুন কূটনৈতিক পথে শেখ হাসিনা ফেরানোর চেষ্টা

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক।একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দেশজুড়ে টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাস্তায় উত্তাল ছাত্র-জনতা, রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া এবং আন্তর্জাতিক চাপ—এই সবকিছুর এক চরম সমাহারে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মাত্র ৪৫ মিনিটের এক জটিল ও ঘনঘটাপূর্ণ সময়ের মধ্যেই দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনতার সেই বিজয়গাথা আজও জাতীয় ইতিহাসে গেঁথে আছে, আর দেশের মানুষ আজও জানতে আগ্রহী সেই বিদায়ের প্রকৃত নেপথ্য উপাখ্যান।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল থেকেই সারা দেশে কারফিউ জারি ছিল, যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল আগের রাতেই নিরাপত্তাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে। কিন্তু কারফিউ ভেঙে হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণ সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজপথে নেমে আসে। জনস্রোত ঠেকাতে ব্যর্থ হয় প্রশাসন, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, সকাল ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তড়িঘড়ি করে তিন বাহিনীর প্রধান, পুলিশ মহাপরিদর্শক এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন।

বৈঠকে শেখ হাসিনা আন্দোলন দমন করতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। কিন্তু কর্মকর্তারা একপ্রকার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন—পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে আর কিছু করার নেই। দেশজুড়ে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ একরকম ভেঙে পড়েছে। তখন পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে এবং প্রধানমন্ত্রীর মনে বাস্তবতা গেঁথে দিতে ডাকা হয় তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে। তার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়—এটাই পালানোর একমাত্র সুযোগ।

পরিবারের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা দেশত্যাগে সম্মত হন। এ সময় ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের পক্ষ থেকেও বিমানবন্দরে অবতরণের অনুমতি নিশ্চিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর দুই সন্তান, সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল তখন দেশের বাইরে ছিলেন। তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। পরে জয় এক গণমাধ্যমে জানান, তার মা প্রথমে যেতে রাজি হননি। বরং চেয়েছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা আগে চলে যান। কিন্তু জয় নিজে ফোন করে বোঝান যে, তারাই একসঙ্গে দেশ ত্যাগ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সড়কপথ না নিয়ে হেলিকপ্টার ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত হয়। তেজগাঁওয়ের পুরনো বিমানবন্দরে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় হেলিকপ্টারে করে। সঙ্গে নেওয়া হয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও ব্যাগ। পরে একটি সামরিক পরিবহণ বিমানে তারা দিল্লির উদ্দেশে উড়াল দেন। দেশ ছাড়ার কয়েক ঘণ্টা পর হাসিনার ফ্লাইট ভারতের একটি সামরিক ঘাঁটিতে অবতরণ করে। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আকাশপথে, আর গণভবনে প্রবেশ করে পড়ে জনতা—যেখানে সাধারণ জনগণ বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তটি উদযাপন করে।

এই নাটকীয় দেশত্যাগের ঠিক এক বছর পর, আজ ৫ আগস্ট, দেশের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় রচিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অভিযোগ, জুলাই ও আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে পরিচালিত দমন-পীড়নে গণহত্যা, নির্যাতন ও গুমের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, যার দায়ভার বহন করতে হবে শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের।

বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, এটি ইতিহাসের প্রতি ন্যায়ের প্রতিফলন। তবে আওয়ামী লীগের অবশিষ্ট নেতৃত্ব একে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে দাবি করে যাচ্ছে। যদিও জাতিসংঘের বিশেষ পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক দায়িত্বের অংশ।

এক বছর আগে আজকের দিনে যে আন্দোলন একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটিয়েছিল, সে আন্দোলনের পথ ধরেই নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনা ঘটে। বহু সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে ছাত্র-জনতা এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে একটি নতুন ইতিহাস রচনা করেছে—যেখানে ফ্যাসিবাদের পতনের মধ্য দিয়ে ফিরে এসেছে গণতন্ত্র, ফিরে এসেছে মানুষের বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত