আবু সাঈদ হত্যার বিচার শুরু: জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদের রক্তের জবাব কি এবার মিলবে?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৬ আগস্ট, ২০২৫
  • ১০৬ বার

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন করে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশেষে শুরু হয়েছে। বহু প্রতীক্ষিত এই বিচারিক প্রক্রিয়ার সূচনা হয় বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে, যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার বিচার শুরুর আদেশ দেন।

আবু সাঈদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সারা দেশে যে ক্ষোভ আর আন্দোলনের ঢেউ বয়ে গিয়েছিল, তা ছিল একাধারে রাজনৈতিক অন্যায় এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে এক যুবসমাজের স্পষ্ট জবাব। তার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের আর্তনাদ আরও প্রবল হয়ে ওঠে। এক তরুণ, যিনি দাবি করছিলেন ন্যায্যতার, সংবিধানিক অধিকারের, তার গুলিবিদ্ধ দেহ রক্ত দিয়ে লিখে যায় রাষ্ট্রের বুকে এক নির্মম প্রশ্ন—বিচার কি হবে কখনও?

আবু সাঈদ ছিলেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের স্থানীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী একজন ছাত্র। ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী পার্ক মোড়ে সহপাঠীদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় তিনি পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন। এরপর হাসপাতালেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ শিক্ষার্থী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিচার দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। তাকে “জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ” হিসেবে স্মরণ করে দেশব্যাপী এক শোকাবহ সম্মাননা প্রদর্শন করা হয়।

বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বুধবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ চার অভিযুক্তকে। তারা হলেন—বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, পুলিশের সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী। প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই রয়েছে গুরুতর অভিযোগ—আবু সাঈদের আন্দোলন দমন এবং হত্যাকাণ্ড সংঘটনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা।

মামলায় আরও ২৪ জন আসামি পলাতক রয়েছেন। তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীদের মাধ্যমে ৩০ জুলাই অব্যাহতির আবেদন জানানো হয়। এর আগেই, ২৯ জুলাই ৬ জন আসামির পক্ষে অব্যাহতির শুনানি শেষ হয়। কিন্তু আদালত তা বিবেচনার জন্য রেখে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন, যা এই মামলার দীর্ঘ আইনি পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

বিচার শুরু হওয়ার খবরে দেশের ছাত্র সমাজ এবং অধিকারকর্মীরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও, অনেকে এখনও সংশয়ে—এই বিচার কি সত্যিই শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পাবে? দীর্ঘদিন ধরে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়া, তদন্তে বিলম্ব, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের নিষ্ক্রিয়তা—সবই প্রশ্ন তুলেছে এই বিচার প্রক্রিয়ার গতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে।

তবে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীরা স্পষ্ট করে বলছেন—তারা এখন শুধু বিচারপ্রক্রিয়ার দৃষ্টান্তমূলক সমাপ্তি চান না, বরং এমন একটি দৃষ্টান্ত চাচ্ছেন যা ভবিষ্যতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করবে।

এই প্রেক্ষাপটে আবু সাঈদ হত্যার বিচার আর কেবল একটি মামলার বিচার নয়; এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরীক্ষা। যে তরুণ ন্যায়ের জন্য জীবন দিলেন, তার মৃত্যুর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে, আর কতজনকেই বা হারাতে হবে এই রাষ্ট্রের বিবেক জাগানোর জন্য?

বিচারিক প্রক্রিয়ার আগামী দিনগুলোতে কি ঘটবে, তা সময়ই বলবে। তবে আজকের এই সূচনা ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, যখন জনগণের চাপ এবং সংগ্রামের ফলস্বরূপ অবশেষে শুরু হলো একজন শহীদের হত্যার জবাবদিহির পথচলা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত