১৫ দিন পর খুলল মাইলস্টোন কলেজ, বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের ক্ষত নিয়ে ধীরে ফিরছে স্বাভাবিকতা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৬ আগস্ট, ২০২৫
  • ৫৮ বার

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দীর্ঘ ১৫ দিনের নীরবতা ভেঙে আবারও পাঠদানে ফিরল রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। গত ২১ জুলাই বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর যে ভয়াবহতা ও মৃত্যুপুরী তৈরি হয়েছিল, তা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় ৩৪ জনের প্রাণহানি এবং অসংখ্য মানুষের আহত হওয়ার ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো এলাকা, আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল শোক আর আতঙ্কের প্রতীক।

আজ বুধবার, ৬ আগস্ট সকালে কলেজের নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ফের শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসে। সকাল সাড়ে আটটা থেকে নিয়মিত সময়সূচি অনুযায়ী শুরু হয় পাঠদান কার্যক্রম। ইউনিফর্ম পরে, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ক্লাসে আসে শিক্ষার্থীরা—কিন্তু তাদের চোখেমুখে ছিল এক অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতার ভার। মাইলস্টোনের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুল প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন, দীর্ঘ বিরতির পর আজ থেকেই কলেজের পাঠদান কার্যক্রম পুরোদমে চালু হয়েছে।

দুর্ঘটনার পাঁচ দিন পর, গত রোববার শিক্ষার্থীরা প্রথমবার ক্যাম্পাসে ফিরেছিল। তবে সেদিন পাঠদান হয়নি। বরং নিহতদের আত্মার মাগফিরাত ও আহতদের সুস্থতা কামনায় আয়োজিত দোয়া ও শোক অনুষ্ঠানে অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা। নিজেদের মধ্যে আবেগময় আলাপ, বন্ধুত্বপূর্ণ কুশল বিনিময় এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদানের মধ্য দিয়ে তারা একটি ব্যতিক্রমী দিন পার করে। সে তুলনায় আজকের দিন ছিল অনেকটা স্বাভাবিক, যদিও ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি।

উল্লেখ্য, ২১ জুলাই সকালে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিকটবর্তী এলাকায় একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও আগুনে পুড়ে যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন বেশ কিছু বাড়িঘর এবং গাড়ি। ঘটনাস্থলে এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মোট ৩৪ জন, যাদের মধ্যে শিশুও ছিল। অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় অনেকেই এখনো চিকিৎসাধীন আছেন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে।

মাইলস্টোন ক্যাম্পাসে তীব্র মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সহায়তায় স্থাপন করা হয়েছে একটি বিশেষ কাউন্সেলিং সেন্টার। সেখান থেকে ট্রমায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের দেওয়া হচ্ছে পেশাদার মনোসামাজিক সহায়তা, যাতে তারা এই ভয়াবহতার স্মৃতি কাটিয়ে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষক, অভিভাবক ও অন্যান্য কর্মীরাও এই সেবা গ্রহণ করছেন।

অনেকেই মনে করছেন, যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের পর মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি রাজধানীর সাম্প্রতিককালের অন্যতম গভীর ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে একধরনের ভয়, শূন্যতা এবং মানসিক ভারগ্রস্ততা স্পষ্টভাবেই দৃশ্যমান। এই শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ এখনও ভয় পায় আকাশের শব্দে, কেউবা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দেয়ালে ঝুলে থাকা আগের দিনের হাস্যোজ্জ্বল ছবি ও ব্যানারের দিকে।

তবে সব অন্ধকারের মধ্যেও একটুখানি আশার আলো জ্বলছে—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবারও বইছে শিক্ষার বাতাস। পাঠদানের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে ফিরছে স্বাভাবিকতা। শিক্ষকরা নিজেদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়ে চেষ্টা করছেন শিক্ষার্থীদের মনোসংযোগ ফিরিয়ে আনতে। বন্ধুরা একে অন্যকে সাহস দিচ্ছে। অভিভাবকরা সন্তানের হাত ধরে স্কুলে এসে মনোবল জোগাচ্ছেন।

জাতি হিসেবে এমন এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক, মানসিক ও নৈতিক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা আজ নতুন করে সামনে এসেছে। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্র শুধুমাত্র একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নয়—এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রতিরোধ ও জীবনের প্রতি আমাদের অপরিসীম ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘ শোকের প্রহর পেরিয়ে, ধূলি-ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন এক অন্ধকার দিন ভুলে, উত্তরার আকাশে হয়তো আবারো উঁকি দিচ্ছে শিক্ষার সূর্য। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা—এই প্রতিষ্ঠান ও এর শিক্ষার্থীরা আবারও আগের মতো প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে, যদিও হারানো মুখগুলো চিরকাল এক শূন্যতার নাম হয়ে থাকবে তাদের হৃদয়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত