প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিশেষ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ভিত্তিতে নির্বাচন আয়োজনের দাবি তোলা ইসলামি দলগুলো, বিশেষত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নতুন করে শর্ত আরোপের মাধ্যমে এক ধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, শুধু ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর আলোকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে। অন্যথায় রাজনৈতিক পরিবেশ আরও জটিল হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
সংবিধান অনুসারে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন – পিআর) পদ্ধতির দাবি দীর্ঘদিন ধরেই জানিয়ে আসছে জামায়াত। এই পদ্ধতির অনুপস্থিতিতে দলটি নির্বাচন অংশ নেবে কিনা—এমন প্রশ্নে সৈয়দ তাহের দ্ব্যর্থহীনভাবে জানান, এটি তাদের অন্যতম রাজনৈতিক দাবি এবং তারা এই দাবি বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন অব্যাহত রাখবে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় ভবিষ্যতে নেয়া হবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
সৈয়দ তাহের অভিযোগ করেন, সদ্য ঘোষিত ‘জুলাই জাতীয় ঘোষণাপত্র’ মূলত একটি অসম্পূর্ণ দলিল। এতে গণমানুষের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটেনি। ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক আজাদি সংগ্রাম থেকে শুরু করে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড এবং ২৮ অক্টোবরের ঘটনার মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে আলেম-ওলামা, মাদ্রাসাশিক্ষক, ছাত্র, প্রবাসী ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের ভূমিকাকে উপেক্ষা করার বিষয়টি, যা তিনি ইতিহাসের প্রতি চরম অবিচার বলে অভিহিত করেছেন।
তাঁর মতে, জুলাই গণ-আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। আর সেই লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে ১৯টি বিষয়ে ঐকমত্য গঠনের ভিত্তিতে যে ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, সেটি ঘোষণাপত্রে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সৈয়দ তাহের আরও বলেন, ‘ঘোষণায় কবে, কীভাবে এই সনদ কার্যকর হবে তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। বরং এটি পরবর্তী সরকারকে বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়ে ঘোষণাটিকে এক প্রকার গুরুত্বহীন করা হয়েছে। এতে করে হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ ও জুলাই চেতনা হুমকির মুখে পড়েছে।’
এছাড়া তিনি সমালোচনা করেন, ঘোষণার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা না করার সিদ্ধান্তে পুরো জাতি হতবাক ও হতাশ হয়েছে। সাধারণত এমন ঘোষণার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল, যা এবার উপেক্ষিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও দলটির পক্ষ থেকে এই ঘোষণাকে জাতীয় স্বার্থে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’কে আইনি ভিত্তি দিয়ে অধ্যাদেশ, এলএফও (লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার) কিংবা গণভোটের মাধ্যমে বাস্তবায়নের রূপরেখা নির্ধারণ করা না হলে, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। এ প্রেক্ষিতে তিনি একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব বাহিনী ও সংস্থাকে নিরপেক্ষভাবে ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্বৈরাচারী প্রভাবমুক্ত একটি প্রশাসন গঠনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষদিকে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ‘জুলাই জাতীয় ঘোষণাপত্র’ ঘিরে যে ধরনের আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অপেক্ষা করছিল, তা অপূর্ণ রয়ে গেছে। ফলে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যারা এই আন্দোলনের জন্য জীবন দিয়েছেন বা আহত হয়েছেন, তাঁদের পরিবার এবং যারা মাঠে থেকে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও আক্ষেপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।” তাই তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, অনতিবিলম্বে জনআকাঙ্ক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ‘জুলাই ঘোষণাপত্রে’ সংযোজন করে, তা একটি পূর্ণাঙ্গ সনদ হিসেবে জাতির সামনে উপস্থাপন করা হোক।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এই বক্তব্য নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। এমন সময়, যখন জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলগুলোর মধ্যকার অবিশ্বাস ও সমঝোতার ঘাটতি। এখন দেখার বিষয়—সরকার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মহল এই দাবি কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়।










