সম্মান চাই সব পেশার মানুষকে, মুছিদের জীবন ও মর্যাদাহীনতার গল্প কি বিলীন হয়ে যাবে কালের গর্ভে?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৭ আগস্ট, ২০২৫
  • ১২৮ বার

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই যখন শহরজুড়ে মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, তখনই শুরু হয় একদল মানুষের নিঃশব্দ কর্মযজ্ঞ। তারা পরিচিত ‘মুচি’ নামে — চামড়াজাত পণ্যের কারিগর ও মেরামতকারীরা, যারা যুগের পর যুগ ধরে আমাদের সমাজের এক নীরব অথচ অপরিহার্য অংশ হিসেবে টিকে আছেন। তাদের হাতের কারিগরিতেই বহু পুরনো জুতা ফিরে পায় নতুন প্রাণ, বহু পরিত্যক্ত সামগ্রী হয় পুনরায় ব্যবহারযোগ্য। অথচ সমাজে আজও এ পেশাটিকে ‘হেয়’ করে দেখা হয়, মর্যাদা দেওয়া হয় না এই পরিশ্রমী মানুষদের।

বাংলাদেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা হাজারো মুচি প্রতিদিন আমাদের জুতার ফিতা লাগানো, সোল পাল্টানো, ছেঁড়া জুতা সেলাই করা, এমনকি চামড়ার ব্যাগ বা স্যান্ডেল মেরামত করার মতো কাজে নিপুণ দক্ষতা দেখিয়ে থাকেন। অনেক সময় তারা দোকান না পেয়ে ফুটপাতেই বসে থাকেন রোদে-গরমে, বৃষ্টিতে-ধুলোয়। কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই, নেই সুনির্দিষ্ট আয়। কখনো ২০ টাকা, কখনো ৫০ টাকার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।

এক সময় সমাজে মুচিদের স্থান ছিল একটি সম্মানজনক কারিগরি পেশার মর্যাদায়। মানুষের প্রয়োজনে তাদের দিকে ফিরে তাকাতে হতোই। কিন্তু কালের পরিবর্তনে এখন টেকসই ও কম দামে তৈরি প্লাস্টিক ও সিনথেটিক জুতার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় জুতা মেরামতের প্রয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। ফলে এই পেশায় জড়িত মানুষদের আয় কমে এসেছে, তারা ছিটকে পড়েছেন মূলধারার সমাজ থেকে। নতুন প্রজন্ম এ পেশাকে পেশা হিসেবে নিতে অনাগ্রহী। যে কারণে মুছিদের সংখ্যা দিন দিন কমছে এবং এক সময় হয়তো এই পেশাটিই হারিয়ে যাবে কালের গর্ভে।

বর্তমানে দেশে অনেকেই নানা কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবিকা গড়ে তুললেও, মুচি পেশার মানুষেরা কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পান না। সরকারি বা বেসরকারি কোনো উদ্যোগ নেই তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য, নেই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় উপযুক্ত অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা। অথচ তারা শহর ও গ্রাম্য জীবনে পরিবেশবান্ধব উপায়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সংস্কৃতি গড়ে তোলার অন্যতম বাহক।

এমনকি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও আজো তাদের অবমূল্যায়নের অন্যতম কারণ। পরিচ্ছন্ন পোষাক, উচ্চারণ বা বাহ্যিক চাকচিক্য না থাকায় বহু মানুষ তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করতেও সংকোচবোধ করে। স্কুলে সন্তানকে শিখানো হয় বড় হতে হবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা শিক্ষক — কিন্তু কখনো বলা হয় না যে, একজন দক্ষ মুচিও হতে পারে সম্মানজনক পেশাজীবী। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সংস্কার না হলে সমাজে কাজের বিভাজন থাকবে, মর্যাদার বৈষম্য থেকেই যাবে।

তবে আশার কথা, বর্তমানে কিছু সংগঠন ও সচেতন নাগরিক সমাজ মুচিসহ হস্তশিল্প, দর্জি, রিকশাচালক, কৃষক— এসব শ্রমনির্ভর পেশার মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন। বিভিন্ন শহরে কিছু উৎসব বা মেলা আয়োজন করা হচ্ছে যেখানে মুচিদের বানানো পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এসব উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও, তা যথেষ্ট নয়।

সরকারি পর্যায়ে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদের ঋণ, মুচিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা, নগরপরিকল্পনায় তাদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মস্থল নির্ধারণ ইত্যাদি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এই পেশাকে পুনর্জীবিত করা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সমাজকে পেশাভিত্তিক বৈষম্য থেকে বেরিয়ে এসে সম্মান দিতে হবে সকল পরিশ্রমী মানুষকে, তাদের পরিচয় নয়— কাজটাই হোক মূল বিবেচ্য।

মুচিরা পায়ে চলা মানুষের প্রতিদিনের সঙ্গী। তারা হারিয়ে গেলে শুধু একটি পেশাই নয়, হারিয়ে যাবে এক ধরণের মানবিকতা, পরিবেশবান্ধব সংস্কৃতি, এবং আমাদের সমাজের অন্তর্নিহিত শ্রদ্ধাবোধ। তাই সময় এসেছে তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর, এবং সম্মান দেওয়ার — প্রত্যেকটি কাজ, প্রত্যেকটি মানুষকেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com