সাম্য ও দ্রোহের কবি নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৯ বার
সাম্য ও দ্রোহের কবি নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাম্য, মানবতা, প্রেম ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। বাংলা সাহিত্যের এই কালজয়ী কবি ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র, ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণের পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও অন্যায়, শোষণ, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর উচ্চারিত শব্দ আজও বাঙালির চেতনায় গভীরভাবে অনুরণিত হয়।

নজরুল শুধু একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, সংগীতস্রষ্টা, সাংবাদিক, গীতিকার, নাট্যকার ও মানবমুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর সৃষ্টিতে যেমন প্রেম ও সৌন্দর্যের কোমল আবেগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। তাই বাংলা সাহিত্যে তিনি একই সঙ্গে ‘বিদ্রোহী কবি’ ও সাম্যের কবি হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছেন।

১৮৯৯ সালের ২৪ মে, ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর শৈশব কেটেছে দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর পরিবারের আর্থিক সংকট তাঁকে খুব অল্প বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে। জীবিকার প্রয়োজনে কখনো মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেছেন, কখনো লেটোর দলে গান ও নাটকে যুক্ত হয়েছেন। জীবনের এই বিচিত্র অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্য ও চিন্তার জগৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

কৈশোর ও তারুণ্যে নজরুলের মধ্যে সাহিত্য, সংগীত ও অভিনয়ের প্রতি প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেনাজীবন তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে থাকার অভিজ্ঞতা এবং উপনিবেশিক সমাজের বাস্তবতা তাঁর চিন্তাজগতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। সেনাজীবন শেষে কলকাতায় ফিরে তিনি পুরোদমে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করেন।

নজরুলের সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় তাঁর বিদ্রোহী চেতনা। ১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাঁকে রাতারাতি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত কবিতে পরিণত করে। এই কবিতায় তিনি মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসকে এক অনন্য কাব্যিক শক্তিতে প্রকাশ করেন। তাঁর সৃষ্টির বিদ্রোহ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সব ধরনের অন্যায়, শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর অবস্থান।

নজরুলের সাহিত্যচর্চা ছিল বহুমাত্রিক। কবিতার পাশাপাশি তিনি লিখেছেন অসংখ্য গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক ও প্রবন্ধধর্মী রচনা। ইসলামী সংগীত, হামদ, নাত ও গজলের পাশাপাশি তিনি শ্যামাসংগীত ও অন্যান্য ধারার গানও রচনা করেছেন। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তাঁর সৃষ্টিতে যে স্বাভাবিক ও উদারভাবে ধারণ করা হয়েছে, তা বাংলা সংস্কৃতিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

মানুষের পরিচয়কে ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায়ের সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ না রেখে মানবতাকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়ার আহ্বান ছিল তাঁর লেখার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেছেন বারবার। তাঁর সাহিত্য মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, ভালোবাসা ও সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে। এ কারণেই তাঁর রচনা শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের কারণেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।

নজরুলের সাংবাদিকতাজীবনও ছিল সংগ্রামমুখর। তিনি ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনার মাধ্যমে ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক চেতনা জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তাঁর লেখায় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ প্রকাশ পায়। এর পরিণতিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাবরণ করতে হয়। কারাগারেও তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান থেকে সরে যাননি। তাঁর অনশন ও কারাজীবন তৎকালীন সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

নজরুলের জীবন ছিল মাত্র ২৩ বছরের সৃষ্টিশীল কর্মযাত্রায় ভরপুর। এত অল্প সময়ে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে যে বিপুল সৃষ্টি উপহার দিয়েছেন, তা বিস্ময়কর। তাঁর কবিতায় কখনো যুদ্ধের দামামা, কখনো প্রেমের কোমলতা, কখনো নিপীড়িত মানুষের কান্না, আবার কখনো মুক্তির দুরন্ত আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশুরি আর হাতে রণ-তূর্য’—এই দ্বৈত সত্তাই যেন তাঁর সাহিত্যজগতের মূল পরিচয়।

জীবনের শেষদিকে দুরারোগ্য অসুস্থতার কারণে তাঁর সৃষ্টিশীলতা থেমে যায়। দীর্ঘ সময় তিনি নির্বাক ও অসুস্থ অবস্থায় কাটিয়েছেন। তবুও তাঁর সাহিত্যকর্ম থেমে থাকেনি; বরং পাঠক, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের কাছে তাঁর সৃষ্টি নতুন নতুন ব্যাখ্যা ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে কবিকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়। রাজধানীর ধানমণ্ডিতে তাঁর বসবাসের জন্য বাড়ি দেওয়া হয়। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি দ্রুতই জাতীয় চেতনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হন।

১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে নাগরিকত্ব দেয় এবং একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। ওই বছরের ২৯ আগস্ট ঢাকায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর সমাধি আজও কবির স্মৃতির সঙ্গে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও জাতীয় জীবনের গভীর সংযোগের প্রতীক হয়ে আছে।

নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকী প্রতিবছর বাংলাদেশে গভীর শ্রদ্ধা ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়। এবারও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠন কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কর্মসূচি নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে সকালে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রা হবে। অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে শোভাযাত্রাটি কবির সমাধির দিকে যাবে। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠের পর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণের ৫০ বছর পূর্ণ হলেও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা যেন আরও বেড়েছে। সমাজে যখন বৈষম্য, সহিংসতা, নিপীড়ন কিংবা সাম্প্রদায়িক বিভাজন মানুষের সামনে নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি করে, তখন নজরুলের সাহিত্য আবারও মানুষকে সাম্য ও মানবতার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর বিদ্রোহ মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেয়, তাঁর প্রেম মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়, আর তাঁর সাম্যের বাণী মনে করিয়ে দেয়—মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা।

নজরুল তাই কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের কবি নন। তাঁর সাহিত্য সময়ের সীমানা অতিক্রম করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। তাঁর গান, কবিতা ও চিন্তা বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও মানুষের মননে আজও জীবন্ত। মৃত্যু তাঁকে শারীরিকভাবে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে, কিন্তু তাঁর শব্দ, সুর ও স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে মানুষের কণ্ঠে, কবিতার পঙ্‌ক্তিতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত প্রতিটি প্রতিবাদে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত