সোনালি আঁশে ফিরছে কৃষকের মুখে আশার হাসি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

একসময় দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত ছিল পাট। ‘সোনালি আঁশ’ নামে খ্যাত এই কৃষিপণ্য শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎসই ছিল না, বরং লাখো কৃষক পরিবারের জীবিকা ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তিও গড়ে তুলেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিনথেটিক তন্তুর বিস্তার, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং নীতিগত নানা সীমাবদ্ধতায় পাটের সেই জৌলুস অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। তবে চলতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো বগুড়ার গাবতলী ও সারিয়াকান্দি উপজেলায় পাটের মাঠে আবারও ফিরেছে আশার আলো। ভালো দাম, বাড়তি আবাদ এবং উৎপাদনের অনুকূল আবহাওয়া কৃষকদের মধ্যে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

বর্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাবতলী ও সারিয়াকান্দির বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন পাট কাটার ব্যস্ততা। কোথাও কৃষকেরা কাস্তে হাতে পাট কাটছেন, কোথাও নদী, খাল কিংবা জলাবদ্ধ জমিতে পাট জাগ দিচ্ছেন। আবার কোনো এলাকায় চলছে আঁশ ছাড়ানোর কাজ। শুকনো মাঠে সারি করে রাখা হচ্ছে পাটকাঠি, আর বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য আঁশ শুকিয়ে গুছিয়ে রাখা হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে দেখা যাচ্ছে গ্রামীণ জীবনের প্রাণচাঞ্চল্য, যা কেবল একটি ফসলের মৌসুম নয়, বরং একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিশীলতার প্রতিচ্ছবি।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর পাটের বাজারমূল্য সন্তোষজনক থাকায় অনেক কৃষক অন্যান্য ফসলের পরিবর্তে পাট আবাদে আগ্রহী হয়েছেন। ফলে সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে। অনুকূল বৃষ্টিপাত, সময়মতো বীজ বপন এবং রোগবালাই তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদনও আশাব্যঞ্জক হয়েছে।

কৃষকদের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে পাটের দাম ওঠানামা করলেও এবার বাজারে ভালো মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা তাদের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। অনেকেই জানিয়েছেন, উৎপাদন খরচ বেড়েছে ঠিকই, তবে বর্তমান বাজারদর সেই ব্যয় পুষিয়ে লাভের সুযোগ সৃষ্টি করছে। ফলে দীর্ঘদিন পর আবারও পাটকে লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন তারা।

গাবতলীর কয়েকজন কৃষক জানান, ধান বা অন্যান্য ফসলের তুলনায় পাটে শ্রম বেশি লাগলেও বাজারে দাম ভালো থাকলে সেই পরিশ্রম সার্থক হয়। পাট কাটার সময় স্থানীয় শ্রমিকদেরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। মাঠ থেকে পাট পরিবহন, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, শুকানো এবং বাজারজাতকরণ—প্রতিটি ধাপেই অসংখ্য মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।

সারিয়াকান্দির যমুনা তীরবর্তী এলাকাগুলোতে এখন নদীর পানিতে সারিবদ্ধভাবে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে পাটের আঁটি। নির্দিষ্ট সময় জাগ দেওয়ার পর দক্ষ হাতে আঁশ ছাড়ানোর দৃশ্য যেন গ্রামীণ বাংলার চিরচেনা ঐতিহ্যের অংশ। নদীর পাড়ে নারী-পুরুষ মিলেই ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ আঁশ পরিষ্কার করছেন, কেউ রোদে শুকাচ্ছেন, আবার কেউ পাটকাঠি আলাদা করে স্তূপ করে রাখছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ার ফলে পাটের সম্ভাবনাও নতুন করে উজ্জ্বল হচ্ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। ব্যাগ, কার্পেট, জিও-টেক্সটাইল, কম্পোজিট উপকরণ, কাগজ এবং নানাবিধ শিল্পপণ্য তৈরিতে পাটের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশ যদি উৎপাদনের পাশাপাশি পাটজাত পণ্যের বহুমুখীকরণে গুরুত্ব দিতে পারে, তাহলে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি দেশের রপ্তানি আয়ের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, পাট শুধু অর্থকরী ফসল নয়, এটি পরিবেশবান্ধবও। জমির উর্বরতা রক্ষা, কার্বন শোষণ এবং প্লাস্টিক দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে পাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রাকৃতিক তন্তুর ব্যবহার বাড়ানোর যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

তবে কৃষকদের দাবি, শুধু ভালো বাজারদরই যথেষ্ট নয়। উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রয়োজন উন্নতমানের বীজ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, আধুনিক পদ্ধতিতে পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষক যাতে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতভাবে পান, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

অনেক কৃষক জানান, বর্ষাকালে নদী ও খালে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। কোথাও কোথাও দূরের জলাশয়ে পাট নিয়ে যেতে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়ও গুনতে হয়। এছাড়া শ্রমিক সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। তবুও এবার বাজারমূল্য আশাব্যঞ্জক হওয়ায় এসব চ্যালেঞ্জ কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে পারছেন তারা।

পাট ব্যবসায়ীদের মতে, মৌসুমের শুরু থেকেই বাজারে ভালো মানের পাটের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নতমানের আঁশ সংগ্রহে আগ্রহ দেখাচ্ছে। যদি বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকে, তাহলে মৌসুমজুড়েই কৃষকরা লাভজনক দাম পেতে পারেন।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দেশের কৃষি অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পাটকে কেন্দ্র করে শিল্পায়নের সুযোগ রয়েছে। কাঁচা পাট রপ্তানির পাশাপাশি দেশে উচ্চমূল্যের পাটজাত শিল্প গড়ে তোলা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বৃদ্ধি পাবে। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ, গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বগুড়ার মাঠে এখন যে কর্মব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে, তা শুধু একটি মৌসুমি দৃশ্য নয়; এটি কৃষকের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। ভালো দাম পেলে কৃষক আবারও পাট চাষে ফিরবেন—এমন বিশ্বাস অনেকের মধ্যেই তৈরি হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে সোনালি আঁশকে ঘিরে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ ফিরে আসতে পারে।

একসময় যে পাট বাংলাদেশের পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক ছিল, সেই পাট আবারও সম্ভাবনার নতুন বার্তা দিচ্ছে। কৃষকের ঘরে যদি ন্যায্য মূল্য পৌঁছায়, বাজারে যদি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং পাটভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটে, তাহলে সোনালি আঁশের সেই হারানো সুদিন আবারও ফিরতে পারে। বগুড়ার গাবতলী ও সারিয়াকান্দির মাঠ আজ সেই আশাবাদেরই বাস্তব প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত