প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বিমান হামলার সতর্কবার্তা জারির পরপরই একাধিক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে শনিবার ভোররাতের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। সৌদি কর্তৃপক্ষের জরুরি সতর্কবার্তা পাওয়ার পর রাজধানীর বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে অবস্থান করতে বলা হয়েছিল। সতর্কবার্তা জারির কিছুক্ষণের মধ্যেই রিয়াদের বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় বলে জানিয়েছেন সেখানে থাকা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকেরা।
প্রাথমিকভাবে বিস্ফোরণের উৎস বা হামলায় কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবরও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে।
রিয়াদের বাসিন্দাদের মুঠোফোনে পাঠানো জরুরি সতর্কবার্তায় বলা হয়, রাজধানীসহ সংশ্লিষ্ট এলাকা শত্রুপক্ষের বিমান, ড্রোন অথবা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে বা ঘরের ভেতরে অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সতর্কবার্তা পাওয়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়। এর কিছুক্ষণ পরই দুটি বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর পরিস্থিতির ঝুঁকি কমে যাওয়ায় জরুরি সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
রিয়াদে এমন সতর্কতা ও বিস্ফোরণের ঘটনা সৌদি আরবের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে সংঘাত নতুন মাত্রা পাওয়ার পর এই প্রথম রাজধানী রিয়াদ সরাসরি হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে সামনে এসেছে। এর আগে সৌদি আরবের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটলেও রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে এমন জরুরি সতর্কতা আঞ্চলিক পরিস্থিতির নতুন মাত্রা তুলে ধরেছে।
ইরান-সমর্থিত হুতি আন্দোলন ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অন্যতম প্রধান পক্ষ। ইয়েমেনের জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ বিস্তীর্ণ অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগরের ইয়েমেন উপকূলজুড়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর জন্য হুতিদের অভিযান আরও তীব্র হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগও বেড়েছে।
বাব আল-মানদেব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করেছে। এ জলপথ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য এবং জ্বালানি পরিবহন হয়ে থাকে। ফলে এখানে সামরিক সংঘাত বা নৌ অবরোধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ওপরও বাব আল-মানদেব প্রণালির গুরুত্ব বেড়েছে। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হওয়ার পর সৌদি আরব বিকল্প সমুদ্রপথ হিসেবে বাব আল-মানদেব ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছিল। কিন্তু ইয়েমেনের হুতিদের সামরিক তৎপরতা ওই পথেও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সামুদ্রিক জাহাজ চলাচলের তথ্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে পুরোপুরি জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়নি। গত সপ্তাহেও তেলবাহী পাঁচটি জাহাজ ওই জলপথ অতিক্রম করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, ঝুঁকি বাড়লেও সৌদি আরব এখনো এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের মাধ্যমে জ্বালানি রপ্তানি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া অন্যান্য দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য আন্তর্জাতিক জলসীমা উন্মুক্ত ও নিরাপদ থাকবে। তবে বাস্তবে সামরিক সংঘাত বাড়লে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য ঝুঁকি কতটা বাড়বে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে।
রিয়াদে সর্বশেষ বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে হামলার প্রকৃতি ও উৎস। সৌদি কর্তৃপক্ষ সতর্কতা জারি করলেও বিস্ফোরণের পর ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিরোধে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করার তথ্যও পাওয়া যায়নি।
তবে ঘটনাটির সময়কাল এবং ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপট এটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে হুতি হামলা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। রিয়াদের মতো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি হওয়ায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক মহলের নজরও আরও বেড়েছে।
এদিকে ইয়েমেনে সংঘাতের মানবিক প্রভাবও দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে ইয়েমেনে ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সংঘাত থেকে বাঁচতে প্রায় তিন হাজার মানুষ সমুদ্রপথে পার্শ্ববর্তী জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন। এর ফলে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, খাদ্য, চিকিৎসা এবং আশ্রয় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে চলা ইয়েমেন সংকটে দেশটির বহু মানুষ বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য এবং মানবিক সংকটের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। নতুন করে সামরিক অভিযান ও সংঘাত তীব্র হলে এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই বাড়লে সাধারণ মানুষের চলাচল ও খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রিয়াদে বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট চিত্র স্পষ্ট নয়। তবে সতর্কবার্তা জারি এবং পরবর্তী সময়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার ঘটনা সৌদি রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে কি না এবং ভবিষ্যতে আরও কোনো হামলার আশঙ্কা আছে কি না, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের পরবর্তী ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে ইয়েমেনের সংঘাত কোন দিকে এগোয় এবং বাব আল-মানদেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে এর কী প্রভাব পড়ে, সেটিও নজরে থাকবে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তার মতো বৃহত্তর অর্থনৈতিক বিষয়ও সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে।