নতুন পে স্কেলে দ্বিগুণের বেশি বেতন, বাস্তবায়ন দুই বছরে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
নতুন পে স্কেলে দ্বিগুণের বেশি বেতন, বাস্তবায়ন দুই বছরে

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে নতুন এই বেতন কাঠামো একযোগে কার্যকর করা হবে না। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আর্থিক সক্ষমতা এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। মূল বেতন বৃদ্ধির কার্যক্রম তিনটি ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, আর বিভিন্ন ভাতা একযোগে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৮ সালের শুরু থেকে।

সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। একই বৈঠকে জাতীয় পে স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হবে এবং পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদসচিব ড. নাসিমুল গনি নতুন বেতন কাঠামো এবং এর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে সেসব সুপারিশ পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বেতন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য একটি সচিব কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির দাখিল করা প্রতিবেদন পরবর্তীতে মন্ত্রিসভার বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতেই জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো এর ধাপভিত্তিক বাস্তবায়ন। সরকারের হিসাবে, নতুন বেতন স্কেল একযোগে কার্যকর করা হলে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই পুরো কাঠামো একবারে কার্যকর না করে দুই অর্থবছরে ভাগ করে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭ সময়ের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এর ফলে বেতন বৃদ্ধি একবারে না হয়ে নির্ধারিত পর্যায়ে কার্যকর হবে। অন্যদিকে বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে তুলনামূলক কম আয়ের কর্মচারীদের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মচারীরা নতুন কাঠামোর সুবিধা তুলনামূলক দ্রুত পাওয়ার সুযোগ পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে বাড়তি খরচের চাপ সরকারি কর্মচারীদের ওপর পড়ছে। নতুন বেতন কাঠামোর মাধ্যমে তাদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

তবে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক দায়ও তৈরি হবে। সরকারের হিসাবে, নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই অর্থ সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধার অতিরিক্ত ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় রাখা হবে। অর্থাৎ নতুন পে স্কেলের ব্যয় মেটাতে সরকারকে আগামী কয়েক বছরের বাজেট পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে।

নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধাভোগীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। সরকারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নতুন জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী উপকৃত হবেন। পাশাপাশি সোয়া ৯ লাখের বেশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী এবং অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীরাও নতুন কাঠামোর আওতায় আর্থিক সুবিধা পাবেন।

পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও ধাপভিত্তিক সুবিধা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি পেনশনভোগীদের নিট পেনশনও পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। ফলে দীর্ঘদিন সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনের পর অবসরে থাকা ব্যক্তিদের আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টিও নতুন কাঠামোয় গুরুত্ব পেয়েছে।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক একটি কমিটি কাজ করবে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য আলাদা বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে। তবে সেটিও জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে একই ধরনের ধাপভিত্তিক পদ্ধতিতে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে অর্থ বিভাগ। প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, সরকারি আদেশ এবং বিস্তারিত নির্দেশনা জারি করবে অর্থ বিভাগ। এসব নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ধরনের ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সম্পর্কে বিস্তারিত বিধান উল্লেখ থাকবে।

সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর এবং সংস্থাকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হবে। কারণ প্রায় ২৪ লাখ কর্মচারীকে নতুন কাঠামোর আওতায় আনতে প্রশাসনিকভাবে বড় ধরনের সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে।

অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন একদিকে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পারে, অন্যদিকে সরকারের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে। অতিরিক্ত বেতন-ভাতা অর্থনীতিতে নতুন অর্থপ্রবাহ তৈরি করতে পারে। তাই সরকারের ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তকে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

সরকার মনে করছে, একযোগে পুরো বেতন কাঠামো কার্যকর করলে বাজারে চাহিদা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই চাপ তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হবে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের অন্যতম লক্ষ্য হলো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের কর্মোদ্যম বাড়ানো। আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি দক্ষ, গতিশীল এবং জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলার প্রত্যাশা করছে সরকার।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেতন বৃদ্ধি শুধু ব্যক্তিগত আয় বাড়ার বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্কিত। একজন সরকারি কর্মচারীর জীবনযাত্রার মান, কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার সঙ্গে তার আর্থিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। নতুন পে স্কেল সেই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিপুল অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করা। প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় সরকারি বাজেটের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করবে। ফলে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে।

সব মিলিয়ে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের মাধ্যমে নতুন কাঠামোতে বেতনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।

তবে এই সুবিধা একদিনে পুরোপুরি কার্যকর হবে না। ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে বেতন স্কেল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার আর্থিক চাপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের নতুন কাঠামোর আওতায় আনতে চায়। মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর হওয়ার পর ২০২৮ সালের শুরু থেকে ভাতাসমূহ একযোগে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রায় ২৪ লাখ কর্মরত সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখের বেশি অবসরপ্রাপ্ত ও অন্যান্য সুবিধাভোগীর জন্য নতুন এই সিদ্ধান্ত দেশের সরকারি চাকরি ও পেনশন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। এখন অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ও বিস্তারিত নির্দেশনার মাধ্যমে ধাপে ধাপে স্পষ্ট হবে কোন গ্রেডে, কোন সময়ে এবং কীভাবে নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণ সুবিধা কার্যকর হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত