প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আয়কর খাতে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় জুলাই মাসে আয়কর আদায় কম হয়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকার কর অঞ্চল-৪ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে। উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ অঞ্চলের আদায়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম হওয়ায় রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে সারাদেশের আয়কর খাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৭ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। শতাংশের হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১৭ শতাংশ।
নতুন অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। নতুন চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের নেতৃত্বে অর্থবছরের কার্যক্রম শুরু হলেও জুলাইয়ের রাজস্ব আদায়ের বিস্তারিত তথ্য আগস্টের শেষদিকে এসে প্রকাশ্যে এসেছে। ২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত জুলাই মাসের রাজস্ব সভায় আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট অনুবিভাগ নিজেদের রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান উপস্থাপন করে। ওই সভায় বিভিন্ন কর অঞ্চলের আয়কর আদায়ের চিত্রও উঠে আসে।
৫০টি কর অঞ্চল ও বৃহৎ করদাতা ইউনিটের জুলাইয়ের রাজস্ব আদায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে ঢাকার কর অঞ্চল-৪-এ। জুলাই মাসে এই কর অঞ্চলের জন্য ৪২৫ কোটি ২০ লাখ টাকা আয়কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু মাস শেষে আদায় হয়েছে মাত্র ৯৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে ৩২৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
তবে আগের বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাইয়ে কর অঞ্চল-৪ থেকে আদায় হয়েছিল মাত্র ৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। সেই হিসাবে চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে আদায় বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ঘাটতি থাকলেও আগের বছরের তুলনায় অঞ্চলটির রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
কর অঞ্চল-৪-এর কার্যক্রমে করদাতা পুনর্বিন্যাসের প্রভাবও পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অঞ্চলের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের জন্য কর অঞ্চল-৪-এ তুলনামূলকভাবে বেশি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই অঞ্চল থেকে প্রায় ৮০ হাজার করদাতাকে অন্য কর অঞ্চলে স্থানান্তর করা হয়েছে। স্থানান্তরিত করদাতাদের মধ্যে ঠিকাদারসহ বিভিন্ন সেবা ও পেশার সঙ্গে যুক্ত করদাতারাও রয়েছেন।
অন্যদিকে, কর অঞ্চল-৪-এ নতুন করে প্রায় ৪০ হাজার টিআইএন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে একদিকে বিপুলসংখ্যক করদাতা অন্য অঞ্চলে চলে গেছেন, অন্যদিকে নতুন করদাতা যুক্ত হলেও তাদের কর আদায়ের সক্ষমতা ও সময়ের সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, করদাতা পুনর্বিন্যাসের কারণে একটি কর অঞ্চলের স্বাভাবিক রাজস্ব প্রবাহে সাময়িক পরিবর্তন আসতে পারে।
কর অঞ্চল-৪-এর বকেয়া রাজস্বের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। জুলাই পর্যন্ত এ অঞ্চলে বিতর্কিত বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর বাইরে অবিতর্কিত বকেয়া রয়েছে ৩৩৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ কর অঞ্চলটিতে মোট বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ ১ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার বেশি। এসব বকেয়া থেকে জুলাই মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
বকেয়া রাজস্ব আদায় করা কর প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বিতর্কিত বকেয়ার ক্ষেত্রে মামলা, আপিল বা অন্যান্য আইনি জটিলতা থাকায় দ্রুত অর্থ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে অবিতর্কিত বকেয়া থেকে দ্রুত আদায় বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে রাজস্ব ঘাটতি কিছুটা কমানো সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ঢাকার অন্যান্য কর অঞ্চলের জুলাইয়ের পরিসংখ্যানেও লক্ষ্যমাত্রা ও আদায়ের মধ্যে ব্যবধান দেখা গেছে। কর অঞ্চল-১-এর জুলাই মাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৯৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫৬৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। যদিও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি, গত অর্থবছরের জুলাইয়ের ৪৩১ কোটি ৯৩ লাখ টাকার তুলনায় এবার আদায় বেড়েছে।
কর অঞ্চল-২-এ জুলাই মাসে ১৪৫ কোটি ২০ লাখ টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আদায় হয়েছে ৬৮ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই মাসে এ অঞ্চলে আদায় হয়েছিল ৪৬ কোটি ৯ লাখ টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে থাকলেও বছরওয়ারি তুলনায় আদায় বেড়েছে।
কর অঞ্চল-৩-এর জুলাই মাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সেখানে আদায় হয়েছে ৫৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকার মতো। ফলে এবার এ অঞ্চলে বছরওয়ারি হিসাবে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
কর অঞ্চল-৫ জুলাই মাসে ৯৮ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা আদায় করেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৬৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। অন্যদিকে কর অঞ্চল-৬-এর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩২ কোটি ৩ লাখ টাকা। গত বছরের জুলাইয়ে এ অঞ্চলে আদায় হয়েছিল ২৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
কর অঞ্চল-৭-এর জুলাই মাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬১ কোটি ২০ লাখ টাকা। সেখানে আদায় হয়েছে মাত্র ২৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল ২৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ অঞ্চলে এবার শুধু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতিই নয়, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আদায় কমেছে।
সামগ্রিকভাবে জুলাইয়ের পরিসংখ্যান বলছে, আয়কর খাতে রাজস্ব আদায়ে বছরের শুরুতেই বড় চাপ তৈরি হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে করদাতার সংখ্যা, কর অঞ্চলের কাঠামো, পূর্ববর্তী বছরের আদায় এবং বকেয়া রাজস্বের বাস্তব অবস্থা কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। কারণ লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব আদায়ের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকলে পুরো অর্থবছরের রাজস্ব পরিকল্পনাতেও চাপ তৈরি হতে পারে।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি কর প্রশাসনের দক্ষতা, কর ফাঁকি রোধ, বকেয়া আদায় এবং করদাতাদের নিয়মিত রিটার্ন ও কর পরিশোধে উৎসাহিত করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর অঞ্চল পুনর্বিন্যাসের ফলে কোন অঞ্চলে কতসংখ্যক করদাতা স্থানান্তরিত হচ্ছে এবং নতুন করে কতজন যুক্ত হচ্ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থবছরের প্রথম মাসের এই চিত্রকে পুরো বছরের চূড়ান্ত প্রবণতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সামনে আরও ১১ মাস রয়েছে এবং এই সময়ে আয়কর আদায়ের গতি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে জুলাইয়ের ঘাটতি নতুন অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব প্রশাসনের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার কর অঞ্চল-৪-এর মতো অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব আদায়ের ব্যবধান কমাতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে পরবর্তী মাসগুলোতে চাপ আরও বাড়তে পারে।
রাজস্ব আদায় সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, উন্নয়ন ব্যয় এবং জনসেবামূলক কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই অর্থবছরের শুরুতে আয়কর আদায়ে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য কর প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ এবং করদাতাদের সহযোগিতা—দুই-ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।