দন্তচিকিৎসক সারা হত্যা: স্বামী রিমান্ডে, তদন্তে নতুন প্রশ্ন

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর দক্ষিণখানে দন্তচিকিৎসক সারা রোকসানা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে। প্রথমদিকে ঘটনাটি চুরি বা ডাকাতির পর হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হলেও তদন্তের অগ্রগতিতে পুলিশের সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন নিহতের স্বামী মো. সোহেল রানা। আদালতের নির্দেশে তাঁকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত, পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এবং ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বেশ কিছু অসংগতি সামনে এসেছে, যা হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালত তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সোহেল রানাকে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাঁকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেছিলেন। শুনানি শেষে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকার আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) আবু বকর সিদ্দিক।

আদালতে শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহাবুদ্দিন শেখ রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিনের আবেদন করেন। তাঁর দাবি, পারিবারিক মনোমালিন্য থাকলেও সোহেল রানা হত্যার সঙ্গে জড়িত নন এবং তাঁকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি তুলে ধরে জানায়, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে সোহেল রানাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সীমিত সময়ের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ডের আদেশের পর আদালত ভবন থেকে বের করে নেওয়ার সময় সাংবাদিকদের সামনে নিজের নির্দোষ দাবি করেন সোহেল রানা। তিনি বলেন, তিনি স্ত্রীকে হত্যা করেননি এবং প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করে তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।

গত ৩০ জুলাই রাজধানীর দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ এলাকার জামতলা গলির একটি বহুতল ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে দন্তচিকিৎসক সারা রোকসানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন নিহতের বোন দক্ষিণখান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহার অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সোহেল রানা তাঁদের ১০ বছর বয়সী মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে কর্মস্থলে চলে যান। বাসায় তখন একাই ছিলেন সারা রোকসানা। বিকেলে স্কুল ছুটির পর তাঁদের মেয়ে একাই বাসায় ফিরে মায়ের কোনো সাড়া না পেয়ে শোবার ঘরে গিয়ে তাঁকে বিছানায় মুখের ওপর বালিশচাপা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। পরে সে স্কুলে ফিরে অধ্যক্ষের মুঠোফোন ব্যবহার করে বাবাকে বিষয়টি জানায়। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।

প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থলে একটি জানালার গ্রিল কাটা অবস্থায় পাওয়া যায় এবং পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, আলমারি থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার খোয়া গেছে। সে কারণে শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, চোর বা ডাকাতরা বাসায় ঢুকে লুটপাটের পর সারা রোকসানাকে হত্যা করে পালিয়ে গেছে। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

তবে তদন্ত যত এগিয়েছে, পুলিশের সন্দেহের দিকও তত পরিবর্তিত হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে দেওয়া রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জানালার গ্রিল কাটা থাকলেও আশপাশের কোনো বাসিন্দা গ্রিল কাটার শব্দ শুনতে পাননি। ঘটনাস্থলের ভেতরের বারান্দায় যে জুতার ছাপ পাওয়া গেছে, তার সঙ্গে সোহেল রানার ব্যবহৃত জুতার মিল রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ওই জুতা নিজের বলে স্বীকার করেছেন। কিন্তু যেদিক দিয়ে বাইরের কেউ প্রবেশ করার কথা, সেই ছাদ বা বিপরীত পাশের কোনো অংশে অপরিচিত ব্যক্তির জুতার ছাপ পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীদের মতে, এই তথ্য ঘটনাটিকে পরিকল্পিত চুরির চেয়ে ভিন্ন কোনো ঘটনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পুলিশের তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। নিহতের মেয়ে জানিয়েছেন, প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার আগে তাঁর মা নিজেই ভেতর থেকে বাসার দরজা আটকে দিতেন। কিন্তু ঘটনার দিন সেই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এটি ঘটনাটির সময়কার পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হতে পারে।

রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়েছে, সোহেল রানা বাসায় ফিরে স্ত্রীকে অচেতন অবস্থায় দেখলেও তাঁকে স্পর্শ করা বা দ্রুত চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীদের মতে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পরিবারের একজন সদস্যের এমন আচরণ প্রশ্নের জন্ম দেয়। একই সঙ্গে দেখা গেছে, সোহেল রানার ব্যবহৃত আলমারি সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল। অন্যদিকে ঘটনাস্থলে পুরোনো খালি গয়নার বাক্সগুলো অত্যন্ত পরিপাটি করে সাজানো অবস্থায় ছিল। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ধারণা, ঘটনাটি প্রকৃত চুরি বা ডাকাতির চেয়ে হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

তদন্তে পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। আদালতে জমা দেওয়া আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সোহেল রানা দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি স্ত্রীকে অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক থাকার সন্দেহ করতেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই পারিবারিক দ্বন্দ্বের বিষয়টি হত্যার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকেও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁদের দাবি, সোহেল রানা দীর্ঘদিন ধরে সারা রোকসানার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, তাঁর একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, যা নিয়ে সংসারে প্রায়ই অশান্তি হতো। নিহতের বোন জানিয়েছেন, মৃত্যুর কিছুদিন আগে সারা রোকসানা তাঁকে ফোন করে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এবং ভবিষ্যতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা করেছিলেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় প্রতিটি আলামত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা ফরেনসিক নমুনা, ডিজিটাল তথ্য, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে তদন্তের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করা হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী বা নির্দোষ ঘোষণা করা সমীচীন নয় বলেও তারা উল্লেখ করেছেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পারিবারিক সহিংসতা, নারীর নিরাপত্তা এবং অপরাধ তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা—সবকটি বিষয়ই এই মামলার সঙ্গে জড়িত। ফলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপনই হবে বিচার প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি।

এদিকে সারা রোকসানার মৃত্যুতে চিকিৎসক সমাজ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে শোক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। একজন চিকিৎসকের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু এবং ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্নের উত্তর জানতে সবাই এখন তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির দিকে তাকিয়ে আছেন।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত