প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর মধ্যেই নতুন একটি স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য সামনে এসেছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত কিছু শিশু একই সঙ্গে এডিনো ভাইরাসেও আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সহসংক্রমণ বা কো-ইনফেকশন রোগীদের জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় এডিনো ভাইরাসের উপস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নজরে আনলেও এখন পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে কোনো বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বা অনুসন্ধান শুরু হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) বিষয়টিতে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং তাদের প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট দেশের অন্যতম প্রধান বিশেষায়িত শিশু চিকিৎসা কেন্দ্র। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জটিল অবস্থার শিশু রোগীদের এই হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কিছু হামের রোগী প্রচলিত চিকিৎসায় প্রত্যাশিত সাড়া দিচ্ছে না এবং তাদের শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিলতা দ্রুত বাড়ছে। এরপর এসব শিশুর ওপর বিস্তারিত পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, চিকিৎসকরা গুরুতর অসুস্থ শিশুদের ওপর ‘রেসপিরেটরি প্যানেল টেস্ট’ শুরু করেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, যেসব শিশুর অবস্থা বেশি জটিল ছিল, তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ হামের পাশাপাশি এডিনো ভাইরাসেও আক্রান্ত।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ৩৫ জন শিশুর নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জনের শরীরে এডিনো ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। যদিও এই নমুনার সংখ্যা সীমিত, তবুও চিকিৎসকদের মতে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, যা আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এডিনো ভাইরাস নতুন কোনো সংক্রমণ নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বহু বছর ধরেই বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ভাইরাস বিদ্যমান। এটি সাধারণত সারা বছরই ছড়িয়ে থাকতে পারে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা কিংবা চোখ ওঠার মতো উপসর্গ সৃষ্টি করে। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সংক্রমণ স্বাভাবিকভাবেই সেরে যায়। তবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল শিশু, নবজাতক কিংবা অন্য সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হামের সঙ্গে এডিনো ভাইরাস একযোগে সংক্রমিত হলে ফুসফুসের জটিলতা দ্রুত বাড়তে পারে। বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকদের ভাষায়, অনেক শিশুর ক্ষেত্রে ‘হোয়াইট লাং’ বা ‘সাদা ফুসফুস’-এর মতো অবস্থা তৈরি হচ্ছে, যেখানে ফুসফুস কার্যকরভাবে অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হতে পারে।
গত ২৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত হাম ব্যবস্থাপনাবিষয়ক এক সভায় বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের প্রতিনিধিরা হামের সঙ্গে এডিনো ভাইরাসের সহসংক্রমণের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন। সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক, হাম বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
তবে পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ গণমাধ্যমকে জানান, তিনি এ ধরনের কো-ইনফেকশনের বিষয়ে অবগত নন এবং শিশু হাসপাতালের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চিঠিও পাননি। তাঁর এই বক্তব্য স্বাস্থ্যখাতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের দাবি, বিষয়টি সভাতেই উপস্থাপন করা হয়েছিল।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি ইতোমধ্যে নজর কাড়তে শুরু করেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংক্রামক রোগ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি বিষয়টি জানতে পারে। এরপর ঢাকায় সিডিসির প্রতিনিধিরা শিশু হাসপাতাল পরিদর্শন করেন এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। জানা গেছে, সিডিসির বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে এসে বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা ও কারিগরি সহযোগিতার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেলে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা এবং নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহসংক্রমণের কারণে যদি রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে, তাহলে চিকিৎসা নির্দেশিকা ও রোগ ব্যবস্থাপনায়ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হতে পারে।
বিশিষ্ট ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, শিশু হাসপাতালের পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত অনুসন্ধান চালানো প্রয়োজন। তাঁর মতে, দেশের প্রধান বিশেষায়িত হাসপাতাল থেকে নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য উঠে এলে তা যাচাই করে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
এরই মধ্যে দেশে হামের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক রয়ে গেছে। চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে নতুন করে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এপ্রিল মাসে ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। পরে জাতীয় পর্যায়ে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান অভিযান পরিচালিত হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগের লক্ষ্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা। তবে পরবর্তী তথ্য অনুযায়ী, একই বয়সসীমায় শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যেতে পারে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে শত শত রোগী ভর্তি হচ্ছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও এই বয়সী শিশুদের মধ্যেই বেশি। ফলে চিকিৎসকরা মনে করছেন, শুধু টিকাদান নয়, গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সহসংক্রমণ শনাক্ত করাও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজন আরও বিস্তৃত গবেষণা, পরীক্ষাগার সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদার করা। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও শিশুদের টিকাদান সম্পন্ন করা, জ্বর-কাশি বা হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।