প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের স্বাস্থ্যখাতকে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার এক যুগান্তকারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে এবং নগর জীবনে চিকিৎসা সেবাকে সহজলভ্য করার লক্ষ্যে সরকার দেশব্যাপী ১৯২টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ‘নগর এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এই নতুন কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, চিকিৎসার অভাবে যেন কোনো নাগরিকের প্রাণহানি না ঘটে, তা নিশ্চিত করাই সরকারের বর্তমান স্বাস্থ্যনীতির প্রধানতম লক্ষ্য।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে নগরবাসীর ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা চাহিদার কথা উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে উপজেলা বা জেলা সদর হাসপাতালে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়াটা একটি ক্লান্তিকর অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এই ভোগান্তি আরও বেশি কষ্টদায়ক। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ১৯২টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে আরও বেশি কার্যকর ও সেবানির্ভর করে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর ফলে শহরতলির মানুষ খুব সহজেই প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিতে পারবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের জটিলতা এড়াতে সাহায্য করবে। স্বাস্থ্যসেবা কেবল দালানকোঠা বা অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে হয় না, বরং এটি হতে হয় মানুষের নাগালের মধ্যে এবং গুণগত মানসম্পন্ন। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবাকে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার এই সম্প্রসারণ কার্যক্রম কোনো নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সারাদেশে বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জানান যে, উপজেলা পর্যায়ে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা চালু করার কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। ডায়ালাইসিস একটি ব্যয়বহুল এবং নিয়মিত প্রক্রিয়ার চিকিৎসা, যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে। এটি উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে আসার অর্থ হলো, হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচানোর পথ সুগম হওয়া। এছাড়া ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এবং জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও ডায়ালাইসিস সুবিধার পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মন্ত্রণালয়। আধুনিক চিকিৎসাসেবার যে সুযোগ-সুবিধাগুলো এতদিন কেবল বড় বড় শহরে সীমাবদ্ধ ছিল, সেগুলো এখন প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানোর এই উদ্যোগ কেবল ওষুধ বা ডাক্তারের সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, ভবন সংস্কার এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতকে একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রতিটি গ্রাম থেকে শুরু করে নগরীর অলিগলি পর্যন্ত যেন চিকিৎসাসেবার কোনো ঘাটতি না থাকে, সেজন্য মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করছে। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেবার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা হচ্ছে। দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন সুষম স্বাস্থ্যসেবা পায় এবং কোনো মানুষ যেন চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ না করে—সেটিই বর্তমান সরকারের দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার।
আলোচনা সভায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মনোযোগ বাড়ানো মানেই দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের মান উন্নত করা। দীর্ঘ মেয়াদে এটি সরকারের ওপর স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ভারও কমিয়ে আনবে, কারণ রোগ জটিল হওয়ার আগেই প্রাথমিক পর্যায়ে তার প্রতিকার সম্ভব হবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হলে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা অনেক সহজ হয়ে উঠবে। সরকারের এই সাহসী ও জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে।
সরকারের এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে। মাঠ পর্যায়ে যারা স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন, তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগীদের সাথে সদাচরণ ও সেবার মান নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, খুব দ্রুতই এই ১৯২টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র পূর্ণাঙ্গরূপে কার্যক্রম শুরু করবে এবং নগরবাসী এর প্রত্যক্ষ সুফল ভোগ করা শুরু করবে। এছাড়া স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নিবিড় মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। উন্নয়ন যেন কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের জীবনযাত্রায় গুণগত পরিবর্তন আনে, সেদিকে মন্ত্রণালয় কঠোর নজর রাখছে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি সুস্থ জাতি গঠনের কোনো বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যসেবা হলো উন্নয়নের একটি প্রধান সূচক। বর্তমান সরকার যে ১৯২টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে, তা কেবল একটি প্রকল্প নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জন্য এক আস্থার প্রতীক। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চাপ কমাতে এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ সময়োপযোগী। সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে যদি মানবিকতার ছোঁয়া থাকে এবং স্বাস্থ্যসেবা যদি সত্যিকার অর্থেই মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়, তবেই দেশ সোনার বাংলায় পরিণত হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার যে অদম্য গতিতে কাজ করে যাচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য খাতে বিশ্বের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।