সর্বশেষ :

আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ: রেফারিং বিতর্ক নিয়ে ফিফার ব্যাখ্যা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৯ বার
আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ: রেফারিং বিতর্ক নিয়ে ফিফার ব্যাখ্যা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই এবং সেই সাথে বিতর্কের জন্ম দেওয়া যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা এবং মিসরের মধ্যকার ম্যাচটি সেই চিরচেনা উত্তেজনার পারদকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা যখন লিওনেল মেসির নেতৃত্বে ৩-২ গোলের অবিশ্বাস্য জয় তুলে নিল, তখন সারা বিশ্বের ফুটবল প্রেমীরা মুগ্ধ হলেও মিসর শিবিরে নেমে আসে শোকের ছায়া। তবে এই নাটকীয় জয় ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে মাঠের রেফারিং। মিসরের একটি গোল বাতিল এবং ম্যাচের শেষদিকে পেনাল্টির দাবি নাকচ করার ঘটনায় কোচ হোসাম হাসানসহ গোটা মিসরীয় দল ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার মাঠে নামল বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।

রেফারিং নিয়ে ওঠা সব প্রশ্ন ও ভিত্তিহীন অভিযোগের প্রেক্ষিতে ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইজি কোলিনা এক দীর্ঘ ও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব কোলিনা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, মাঠের রেফারিদের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং তারা কোনোভাবেই বাইরের কোনো চাপ বা প্রভাবের শিকার নন। এমনকি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোও ম্যাচ পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেন না বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন। কোলিনা তার বক্তব্যে বিনয়ের সাথে কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ফুটবল মাঠে রেফারিদের ওপর ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা কেবল খেলাধুলার সংস্কৃতির বিরোধী নয়, বরং এটি তাদের এবং তাদের পরিবারের জন্য নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি করে।

মিসরের বাতিল হওয়া গোলটি নিয়ে ফুটবল বিশ্বে যে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে, কোলিনা তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। প্রতিটি গোলের আগে আক্রমণভাগের বল দখলের পর্যায় বা ‘অ্যাটাকিং পজেশন ফেজ’ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ভিএআর বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। তার মতে, গোলের মুহূর্ত থেকে কত সময় আগে ফাউলটি হয়েছে বা ঘটনাটি গোলপোস্ট থেকে কত দূরে ঘটেছে, সেটি মোটেও বিবেচ্য নয়। বরং গোল হওয়ার আগে আক্রমণের সূচনালগ্নে যদি কোনো ফাউল শনাক্ত হয়, যা গোল প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, তবে ভিএআর প্রযুক্তি নিয়ম অনুযায়ী রেফারিকে তা জানাতে বাধ্য। আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের ক্ষেত্রে তিনি উদাহরণ হিসেবে জানান, মিসরের ১৯ নম্বর জার্সিধারী মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন, যা ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট ফাউল হিসেবে ধরা পড়েছে। রেফারি মাঠে সরাসরি সেটি দেখতে না পেলেও ভিএআর প্রযুক্তির সাহায্যে তা শনাক্ত করা হয় এবং সঠিক সিদ্ধান্তই গ্রহণ করা হয়েছে।

ম্যাচের শেষ দিকে মোহাম্মদ সালাহ এবং হুলিয়ান আলভারেজের মধ্যকার শারীরিক সংস্পর্শের ফলে সৃষ্ট পেনাল্টির দাবিটিও ফুটবল মহলে বিতর্ক উসকে দিয়েছিল। কোলিনা সেই ঘটনার ব্যাখ্যায় জানান যে, ফুটবলীয় আইন অনুযায়ী কোনো ডিফেন্ডার যদি বলকে স্পর্শ করার পর স্বাভাবিক গতিতে আক্রমণের শিকার হন বা প্রতিপক্ষের সঙ্গে শারীরিক সংস্পর্শ ঘটে, তবে সেটিকে ফাউল হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই। ওই ঘটনায় রেফারি এবং ভিএআর উভয় পক্ষই একে স্বাভাবিক ফুটবলীয় সংঘর্ষ বা ‘নরমাল কন্ট্যাক্ট’ হিসেবে বিবেচনা করেছে। তিনি মনে করেন, কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি রেফারিদের নিজস্ব বিচার-বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে, যা ফুটবলের চিরন্তন সৌন্দর্যের একটি অংশ।

বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে রেফারিদের ওপর যে বিশাল চাপ থাকে, কোলিনা তা স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি বলেন, বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে সীমিত সময়ের ব্যবধানে এত বেশি ম্যাচ পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। অনেক সময় পরিকল্পনামতো সব কিছু না-ও হতে পারে, তবে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ম্যাচ কর্মকর্তারা নিজেদের ক্রমাগত সমৃদ্ধ করছেন। টুর্নামেন্টের আর মাত্র আটটি ম্যাচ বাকি থাকার এই পর্যায়ে এসে তিনি রেফারিংয়ের মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে তিনি খেলোয়াড় এবং কোচদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, গঠনমূলক আলোচনার সুযোগ থাকলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ বা সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা যেন পরিহার করা হয়।

ফিফার এই আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বিশ্বজুড়ে চলমান বিতর্কের কিছুটা হলেও প্রশমন ঘটাবে বলে মনে করছেন ফুটবলবোদ্ধারা। আর্জেন্টিনা এবং মিসরের সেই ম্যাচটি কেবল একটি পরাজয় বা জয় ছিল না, বরং এটি ছিল আবেগের এক বড় লড়াই। মিসরীয় কোচ হোসাম হাসানের তীব্র ক্ষোভ বা আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উল্লাস—সবই ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দিনশেষে কোলিনার এই বার্তাটি পরিষ্কার যে, প্রযুক্তির ব্যবহারে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও মাঠের শেষ সিদ্ধান্তটি রেফারিদেরই এবং তাদের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা ফুটবলের পবিত্রতা রক্ষার অন্যতম শর্ত।

ফুটবল মাঠে ভুল হওয়া স্বাভাবিক, মানুষ হিসেবে রেফারিরাও এর ঊর্ধ্বে নন। তবে সেই ভুল যখন প্রযুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং তার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা থাকে, তখন সেটি আর বিতর্কের জায়গায় থাকে না। ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো থেকে শুরু করে মাঠের সহকারী রেফারি পর্যন্ত সবাই একটি নিয়মভিত্তিক কাঠামো অনুসরণ করেন। কোলিনার এই বক্তব্যটি ফুটবলবিশ্বে একটি শক্তিশালী বার্তা প্রেরণ করল যে, ফিফা কোনো বিতর্কিত প্রভাবের দ্বারা নয় বরং নিয়মের শাসন দ্বারা পরিচালিত হয়। টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলোতে রেফারিং নিয়ে নতুন কোনো বিতর্ক তৈরি না হয়ে বরং ফুটবলের জয়গান গীত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী।

পরিশেষে বলা যায়, আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের এই ঘটনাটি ভবিষ্যতে রেফারিংয়ের ক্ষেত্রে একটি শিক্ষা হয়ে থাকবে। ভিএআর প্রযুক্তির সুবিধা এবং সীমাবদ্ধতা নিয়ে যে সংশয় ছিল, তা কোলিনার ব্যাখ্যায় অনেকাংশে দূর হয়েছে। ফুটবলের ক্রমবর্ধমান আধুনিকায়নের সাথে তাল মিলিয়ে নিয়মকানুন এবং তার প্রয়োগও যে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট। বিতর্কের চেয়ে খেলার শৈল্পিক সৌন্দর্য যেন বড় হয়ে ওঠে, ফিফার সেই প্রচেষ্টায় এই ব্যাখ্যামূলক বিবৃতি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখন ফুটবল বিশ্বের চোখ বিশ্বকাপের শেষ আটটি ম্যাচের ওপর, যেখানে রেফারিদের সততা এবং প্রযুক্তির নিরপেক্ষতা আবারো পরীক্ষার মুখে পড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত