প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শিশুর কান্নাকাটি, অস্থিরতা কিংবা খাবার খাওয়ার পর অস্বস্তি—এসবই অভিভাবকের জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে খাওয়ার পর শিশুর কাশি, পেটে ব্যথা কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে তা থেকে জন্ম নেয় নানা আশঙ্কা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যার অন্যতম কারণ হলো গ্যাস্ট্রো-ইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ। সাধারণত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হলেও, এর পেছনের কারণ ও করণীয় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা প্রতিটি অভিভাবকের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. ফারাহ দোলা এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন, যা আমাদের শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর সংযোগস্থলে প্রাকৃতিকভাবেই একটি শক্তিশালী পেশি বলয় বা আংটার মতো অংশ থাকে। এর প্রধান কাজ হলো পাকস্থলীতে পৌঁছানো খাবারকে পুনরায় ওপরে উঠে আসতে বাধা দেওয়া। কিন্তু ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় এই সংযোগস্থলটি কিছুটা ঢিলেঢালা থাকে। এর ফলে পাকস্থলীর ভেতরে থাকা অ্যাসিড বা খাবার পুনরায় খাদ্যনালিতে উঠে আসে, যাকে আমরা রিফ্লাক্স বলি। জন্মের দুই বা তিন সপ্তাহ বয়স থেকেই এই সমস্যা শুরু হতে পারে এবং কোনো কোনো শিশুর ক্ষেত্রে এক থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত তা স্থায়ী হয়। যদি অন্য কোনো গুরুতর শারীরিক সমস্যা না থাকে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি সময়ের সাথে সাথে সেরে যায় এবং বিশেষ কোনো জটিল চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সমান থাকে না। অপরিণত শিশু, কম ওজনে জন্ম নেওয়া শিশু কিংবা সেরিব্রাল পালসি ও স্নায়ুর বিকাশজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে গ্যাস্ট্রো-ইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্সের প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি দেখা যায়। এই সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে বেশ কিছু স্পষ্ট লক্ষণ ফুটে ওঠে। শিশু যদি অতিরিক্ত কান্নাকাটি করে, কোনো কারণ ছাড়াই শরীরের অস্বাভাবিক মোচড়ামুচড়ি দেয় কিংবা খাবার দেখলেই অনীহা ও কান্নাকাটি শুরু করে, তবে বুঝতে হবে সে রিফ্লাক্সের অস্বস্তিতে ভুগছে। এছাড়া ওজন ঠিকমতো না বাড়া, খাওয়ার পর বুক জ্বালাপোড়া বা স্বর পরিবর্তনের মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রিফ্লাক্সের জটিলতায় শ্বাসনালি আটকে গিয়ে দম বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে অথবা বুক থেকে দীর্ঘমেয়াদী শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যায়।
শিশুর এই অস্বস্তি দূর করতে অভিভাবকদের কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলা আবশ্যক। প্রথমত, একবারে অনেকটা খাবার না খাইয়ে বারবার অল্প অল্প করে খাওয়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। খাওয়ার পরপরই শিশুকে শোয়ানো যাবে না; বরং অন্তত ৩০ মিনিট তাকে সোজা বা ঘাড়ের ওপর খাড়া করে ধরে রাখতে হবে যাতে সে ঢেকুর তুলতে পারে। রিফ্লাক্স বাড়ায় এমন খাবার যেমন ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার, চকলেট এবং টমেটোযুক্ত খাবার শিশুর খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। শোবার সময় শিশুর মাথার দিকের বিছানা সামান্য উঁচু করে রাখাটাও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর সমাধান দেয়। এই সাধারণ জীবনযাত্রার পরিবর্তনগুলো অনেক সময় ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। যদি দেখেন শিশুর ওজন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে, ঘন ঘন প্রচুর পরিমাণে বমি হচ্ছে, বমির সাথে রক্ত বা সবুজ রঙের পিত্তরস বের হচ্ছে, কিংবা শিশু শ্বাসকষ্টে ভুগছে ও ঘন ঘন কাশির কবলে পড়ছে, তবে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসকেরা শিশুর বয়স ও শারীরিক লক্ষণ বিচার করে রোগ নির্ণয় করেন এবং প্রয়োজনবোধে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। মনে রাখা প্রয়োজন, প্রতিটি শিশুই আলাদা এবং তাদের শরীরের গঠন ও সমস্যা অনুযায়ী চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন হতে পারে।
অভিভাবকদের ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া এখানে খুবই জরুরি। শিশুর কান্নাকাটি কিংবা অসুস্থতা সব সময় বাবা-মায়ের জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়। কিন্তু সচেতনতা ও ধৈর্যই পারে এই সংকট মোকাবিলা করতে। আমাদের মনে রাখা উচিত, রিফ্লাক্সের মতো সমস্যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাময়িক এবং সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে শিশুকে দ্রুত সুস্থ ও প্রাণবন্ত করে তোলা সম্ভব। শিশুর প্রতি বাড়তি যত্ন ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত করার মাধ্যমে শৈশবের এই শারীরিক জটিলতাগুলোকে সহজেই জয় করা যায়। চিকিৎসক ফারাহ দোলার পরামর্শ অনুযায়ী, ভয় না পেয়ে সমস্যাটিকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা এবং নিয়ম মেনে চললে আমাদের শিশুরাই বেড়ে উঠবে এক সুস্থ ও সবল ভবিষ্যৎ নিয়ে। প্রতিটি শিশুর হাসি যেন হারিয়ে না যায়, সেই প্রত্যাশায় অভিভাবক হিসেবে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ হওয়া উচিত সতর্ক ও যত্নশীল।