নামাজরত মাকে হত্যায় ছেলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
নামাজরত মাকে হত্যায় ছেলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

প্রকাশ: ১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নামাজরত অবস্থায় বৃদ্ধা মাকে কুঠার দিয়ে কুপিয়ে হত্যার দায়ে ছেলে মো. আবু বক্কর সিদ্দিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে তাকে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিকেলে কুমিল্লার জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক সাবরিনা নার্গিস এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আবু বক্কর সিদ্দিক আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।

রায় ঘোষণার পর তাকে কড়া পুলিশি নিরাপত্তায় কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ১১ অক্টোবর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নের পাশাকোট গ্রামে ঘটে যায় হৃদয়বিদারক এই হত্যাকাণ্ড। নিহত বৃদ্ধা ছিলেন মোছা. খায়েরা বেগম ওরফে খায়রুন্নেছা। ঘটনার সময় তার বয়স ছিল প্রায় ৮০ বছর।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, আবু বক্কর সিদ্দিক দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে তিনি প্রায়ই পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেন। ঘটনার দিনও মাদকের টাকা না পেয়ে তিনি মায়ের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।

একপর্যায়ে দুপুরে জোহরের নামাজ আদায় করতে যান বৃদ্ধা খায়েরা বেগম। নামাজের এক পর্যায়ে তিনি যখন সেজদায় ছিলেন, তখন ছেলে আবু বক্কর সিদ্দিক ধারালো কুঠার দিয়ে তার ওপর হামলা চালান। এলোপাতাড়ি আঘাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

একজন মায়ের জন্য যে মুহূর্তটি ছিল ইবাদতের সময়, সেই সময়েই নিজের সন্তানের হাতে তাকে প্রাণ হারাতে হয়। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। স্থানীয় বাসিন্দারা এমন নৃশংসতায় হতবাক হয়ে যান।

হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় লোকজন আবু বক্কর সিদ্দিককে আটক করেন এবং পরে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। খবর পেয়ে চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়।

এই ঘটনায় নিহতের বড় ছেলে মাওলানা আবুল কাশেম বাদী হয়ে ছোট ভাই আবু বক্কর সিদ্দিককে একমাত্র আসামি করে চৌদ্দগ্রাম থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান চৌদ্দগ্রাম থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. নাসের। তদন্ত শেষে তিনি ২০২১ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর শুরু হয় বিচারিক কার্যক্রম।

দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় আদালত মামলার বিভিন্ন নথি, আলামত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করেন। এ মামলায় মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের পারিপার্শ্বিক তথ্য ও তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণের পর আদালত আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে এ রায় দেন।

রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে সন্তোষ প্রকাশ করেন মামলার বাদী ও নিহতের বড় ছেলে মাওলানা আবুল কাশেম। তিনি বলেন, তার ছোট ভাই দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন এবং মাদকের টাকার জন্য মায়ের ওপর নিয়মিত নির্যাতন চালাতেন।

তিনি জানান, আবু বক্কর সিদ্দিকের আচরণ পরিবর্তনের জন্য পরিবার ও স্থানীয়ভাবে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সময় সামাজিকভাবে সালিশ বৈঠকও করা হয়। কিন্তু তার জীবনযাপনে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

মাওলানা আবুল কাশেম বলেন, “মাদকের টাকার জন্য সে প্রায়ই মায়ের সঙ্গে খারাপ আচরণ করত। শেষ পর্যন্ত নামাজের সময় সেজদারত অবস্থায় মাকে হত্যা করেছে। আদালতের এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।”

তিনি একই সঙ্গে দণ্ড দ্রুত কার্যকরের দাবি জানান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত খায়েরা বেগম ছিলেন শান্ত স্বভাবের একজন ধর্মপ্রাণ নারী। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও তিনি নিয়মিত ইবাদত করতেন। এমন একজন বৃদ্ধ মায়ের সঙ্গে নিজের সন্তানের এমন আচরণ পুরো এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

আইনজীবীদের মতে, পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সংঘটিত অপরাধগুলো সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে মাদকাসক্তির কারণে অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সহিংসতা তৈরি হয়। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবনই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবার ও সমাজের ওপর। অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্ত ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে ভয়াবহ অপরাধের জন্ম দিতে পারে।

কুমিল্লার এই ঘটনা আবারও মাদকাসক্তি ও পারিবারিক সহিংসতার ভয়াবহ দিক সামনে নিয়ে এসেছে। আদালতের রায় ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য কিছুটা স্বস্তি আনলেও হারানো মায়ের শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।

আইনি প্রক্রিয়া শেষে দণ্ডপ্রাপ্ত আবু বক্কর সিদ্দিককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এখন তার সাজা কার্যকরের বিষয়টি পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। তবে এই রায় সমাজে মাদকজনিত সহিংসতা ও পারিবারিক অপরাধের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত