সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কে আনার মহাপরিকল্পনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কে আনার মহাপরিকল্পনা

প্রকাশ: ১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক মানচিত্র এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দেশের প্রতিটি জেলাকে রেল সংযোগের আওতায় নিয়ে আসার যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সরকার নির্ধারণ করেছে, তা এখন কেবল পরিকল্পনার পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং মাঠপর্যায়ে রূপায়ণের পথে এগিয়ে চলছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল দেশের প্রতিটি প্রান্তকে রেললাইনের সুতোয় গেঁথে ফেলা। সেই লক্ষ্য অর্জনে রেল মন্ত্রণালয় বর্তমানে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৪৮টি জেলা রেল সংযোগের আওতায় থাকলেও, বাকি জেলাগুলোকে যুক্ত করার জন্য নেওয়া হয়েছে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। বিশেষ করে পদ্মা সেতুর রেললিংক প্রকল্পের সুফলকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণাঞ্চলকে মূলধারার অর্থনীতির সাথে যুক্ত করার যে স্বপ্ন, তা এখন বাস্তব রূপ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে শুরু করে মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, ঝালকাঠি, বরগুনা এবং পটুয়াখালী পর্যন্ত ২৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেলপথ নির্মাণের সমীক্ষা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সাগরকন্যা কুয়াকাটা পর্যন্ত ট্রেন যোগাযোগের যে দীর্ঘদিনের দাবি, তা পূরণ হবে। এটি কেবল একটি রেলপথ নয়, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ। প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, বরিশালে একটি আধুনিক মাল্টিমোডাল হাব এবং পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। প্রকল্পটিতে ১৯টি বড় স্টেশন, ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়াল রেলপথ এবং কীর্তনখোলা ও পায়রা নদীর মতো বড় বড় জলপথের ওপর ৪৬টি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। ক্রসিংবিহীন ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করতে আন্ডারপাস নির্মাণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যা প্রযুক্তির দিক থেকে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার এক অনন্য উদাহরণ হবে।

এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। রেলপ্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানিয়েছেন যে, সরকার বর্তমানে এই বিপুল অর্থ সংস্থানের উৎস সন্ধানে নিরলস কাজ করছে। একই সঙ্গে যেসব জেলায় এখনো রেল যোগাযোগ পৌঁছায়নি, সেগুলোর জন্য নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। সরকারের এই পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলের রেলপথ সম্প্রসারণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা ও দ্বীপ জেলা ভোলাতে রেল যোগাযোগ স্থাপন। রেলপ্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলাই রেলপথের সংযোগে যুক্ত হবে, যা দেশের অভ্যন্তরে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চিত্র পুরোপুরি বদলে দেবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল রেলপথ নির্মাণ করলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত যৌক্তিক কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, পায়রা বন্দরের মতো বিশাল অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হলে কেবল যাত্রী পরিবহনের চিন্তা করলে চলবে না। বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনের জন্য একটি শক্তিশালী আমদানি-রপ্তানি করিডোর তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। যদি রেললাইন সম্প্রসারণের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা এবং ফরওয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকগুলো তৈরি না হয়, তবে এই বিশাল বিনিয়োগ জনগণের জন্য ঋণের বোঝায় পরিণত হতে পারে। তাই রেলপথের উপযোগিতা বাড়াতে হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞের মতে, প্রতিটি জেলার নিজস্ব বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব আলাদা। কোনো জেলায় হয়তো কৃষিপ্রধান শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি, আবার কোনো জেলায় পর্যটন বা মৎস্যশিল্পের প্রসার ঘটানোর সুযোগ রয়েছে। রেললাইন স্থাপনের সাথে সাথে সেই জেলার বাণিজ্যিক সক্ষমতাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তার সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। জমির ব্যবহার পরিকল্পনা বা ল্যান্ড ইউজ প্ল্যান এবং পরিবহন পরিকল্পনার মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করতে না পারলে রেলপথ তৈরি হবে ঠিকই, কিন্তু প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। রেলকে কেন্দ্র করে জেলাভিত্তিক অর্থনৈতিক বিকাশের যে মডেল, তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে রেলওয়েই হতে পারে সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ পরিবহন মাধ্যম। ঢাকা থেকে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে খুব কম সময়ে পণ্য পৌঁছাতে পারলে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং কৃষক ও উদ্যোক্তারা তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন। এছাড়া দেশের পর্যটন খাতের বিকাশে রেল একটি বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। কুয়াকাটা বা পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা নিরাপদে ও আরামদায়ক উপায়ে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে।

সরকার যখন জেলাগুলোকে রেলের আওতায় নিয়ে আসার কাজ করছে, তখন এটি নিশ্চিত করতে হবে যে নির্মাণ কাজের গুণমান এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার যেন বজায় থাকে। অতীতে অনেক মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণ বা অর্থ সংস্থানের জটিলতায় কাজ দীর্ঘায়িত হয়েছে। এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সুসমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমেই এই লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। প্রতিটি জেলার সাথে রেল সংযোগ কেবল মানচিত্রের সংযোগ নয়, এটি মানুষের সাথে মানুষের, হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের এবং অর্থনীতির সাথে অর্থনীতির এক শক্তিশালী সেতুবন্ধন। বর্তমান সরকারের রেলওয়ে সম্প্রসারণের এই রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ যোগাযোগের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে, যেখানে রেল হবে টেকসই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত