ফিলিপাইনে স্টারলিংকের স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল সেবা চালু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
ফিলিপাইনে স্টারলিংকের স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল সেবা চালু

প্রকাশ:  ০১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করা ফিলিপাইনের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। সাত হাজারের বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দেশটিতে সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় সব এলাকাকে নিয়ে আসা ছিল অনেকটা দুঃসাধ্য। তবে নতুন বছরের শুরুতেই এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সাক্ষী হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ফিলিপাইনে বাণিজ্যিকভাবে চালু হলো স্টারলিংকের স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল বা ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তি। দেশটির শীর্ষ মোবাইল অপারেটর গ্লোব টেলিকম জাতীয় টেলিযোগাযোগ কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে এই প্রযুক্তি দেশজুড়ে উন্মুক্ত করেছে, যা ফিলিপাইনের ডিজিটাল মানচিত্র বদলে দেওয়ার পাশাপাশি জরুরি মুহূর্তের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

প্রচলিত মোবাইল টাওয়ারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সরাসরি নিম্ন কক্ষপথে থাকা স্টারলিংকের স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সংযোগ পাওয়ার এই প্রযুক্তিটি আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন। ফিলিপাইনের প্রায় চার শতাংশ মানুষ যারা এত দিন স্থলভিত্তিক মোবাইল নেটওয়ার্কের নাগালের বাইরে ছিলেন, তারা এখন সরাসরি মহাকাশ থেকে আসা সংকেতের মাধ্যমে সংযুক্ত হতে পারছেন। স্টারলিংকের প্রায় ৬৫০টিরও বেশি সক্রিয় স্যাটেলাইট এখন দেশটির আকাশসীমায় নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করছে। সবচেয়ে আশার কথা হলো, এর জন্য ব্যবহারকারীকে আলাদা কোনো জটিল হার্ডওয়্যারের প্রয়োজন হচ্ছে না। উপযুক্ত অ্যান্ড্রয়েড এলটিই স্মার্টফোন থাকলেই গ্রাহক সরাসরি স্যাটেলাইটের সাথে যুক্ত হতে পারছেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য ডিজিটাল সেবাকে অত্যন্ত সহজলভ্য করে তুলেছে।

এই সেবার বাণিজ্যিক যাত্রার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ প্রস্তুতির ইতিহাস। ফিলিপাইনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশে টাইফুন বা ভূমিকম্পের সময় মোবাইল টাওয়ারগুলো ভেঙে পড়া বা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। গত জুন মাসে দক্ষিণ কোটাবাতো, সুলতান কুদারাত ও সারাঙ্গানির মতো অঞ্চলে যখন ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, তখন স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্ক পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছিল। সেই সংকটের মুহূর্তে এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার করা হয় এবং দেড় লক্ষাধিক মানুষ জরুরি যোগাযোগ রক্ষা করতে সক্ষম হয়। সেই সফলতার পরই গ্লোব টেলিকম এই প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। এটি এখন কেবল একটি বাণিজ্যিক সেবা নয়, বরং ফিলিপাইনের প্রতিটি নাগরিকের জন্য দুর্যোগকালীন নিরাপত্তার এক জীবনরক্ষী কবচ হিসেবে কাজ করবে।

গ্লোব টেলিকমের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কার্ল ক্রুজ এই উদ্যোগকে দেশের ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, এই স্যাটেলাইট রোমিং প্রযুক্তি ফিলিপাইনের ভেতরে ব্যবহার করার সময় গ্রাহককে কোনো অতিরিক্ত রোমিং চার্জ গুনতে হবে না। এটি তাদের মূল সেবার অংশ হিসেবেই গণ্য হবে। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, বিচ্ছিন্ন দ্বীপসমূহ এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে যেখানে বিদ্যুৎ বা টাওয়ার স্থাপন করা প্রায় অসম্ভব, সেখানে এই স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ইন্টারনেট, ভয়েস ও ভিডিও কল এবং নেভিগেশন সুবিধা পৌঁছে দিচ্ছে। এসএমএস বা মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে জরুরি বার্তা আদান-প্রদান করা এখন মুহূর্তের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতীয় টেলিযোগাযোগ কমিশন এই উদ্যোগকে সরকারি ডিজিটাল রূপান্তরের কৌশলের অংশ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। কমিশনের মতে, ফিলিপাইনের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যকে জয় করে সব নাগরিককে ডিজিটাল প্রযুক্তির আওতায় আনার যে লক্ষ্য ছিল, তার বড় একটি অংশ এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পূরণ হবে। ফিলিপাইনের প্রতিটি দ্বীপ এখন ডিজিটাল সংযোগের সুতোয় একে অপরের সাথে গাঁথা পড়ছে। এটি যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে, তেমনি জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তা ও ত্রাণ কার্যক্রম পৌঁছানো অনেক বেশি দ্রুততর করবে।

এই প্রযুক্তির বিস্তৃতি নিয়ে কাজ করা প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, স্টারলিংকের লো-আর্থ অরবিট বা নিম্ন কক্ষপথের স্যাটেলাইটগুলোর কারণে সিগন্যালের গতি অনেক বেশি এবং ল্যাটেন্সি বা বিলম্ব অত্যন্ত কম। এর ফলে সাধারণ মানুষ ঘরের ভেতর বা খোলা আকাশের নিচে বসেই নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক পাচ্ছেন। ফিলিপাইনের মানুষের জন্য এই প্রযুক্তি কেবল একটি বাড়তি সুবিধা নয়, বরং এটি তাদের জীবনের মানোন্নয়নে একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বিশ্বজুড়ে যখন প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় দেশগুলো ব্যস্ত, তখন ফিলিপাইন এই স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

সামনের দিনগুলোতে ফিলিপাইন সরকারের লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি কোণায় এই প্রযুক্তির সুফল পৌঁছে দেওয়া। যদিও এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে, তবে এর সাফল্যের হার যে কোনো দেশের জন্য একটি মাইলফলক হতে পারে। টাইফুন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে থাকা ফিলিপাইন এখন আর বিচ্ছিন্ন থাকবে না। আকাশজুড়ে থাকা স্যাটেলাইটগুলোর এই অভয়ারণ্য নিশ্চিত করবে যে, প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিটি নাগরিক যেন তাদের আপনজন ও প্রয়োজনীয় তথ্যের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে। প্রযুক্তি ও মানুষের প্রয়োজনের যে অপূর্ব মেলবন্ধন এখানে ঘটেছে, তা আধুনিক যুগের এক অনন্য গল্প হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত