বাজেট ২০২৬-২৭: সাধারণের জন্য স্বস্তি নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
বাজেট ২০২৬-২৭: সাধারণের জন্য স্বস্তি নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ?

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন অর্থবছরের সূর্যোদয়ের সাথে সাথে আজ বুধবার থেকে কার্যকর হলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেট। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশেও এসেছে নতুনত্ব। প্রতিটি বাজেট ঘোষণার পরপরই দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সীমিত ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের মনে একটি চাপা উদ্বেগ কাজ করে—এই বাজেট তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বাড়াবে কিংবা কতটা সহজ করবে। করদাতাদের ওপর নতুন কোনো শুল্কের বোঝা চাপল কি না, কিংবা দৈনন্দিন খরচে কোনো স্বস্তি মিলল কি না, তা নিয়েই এখন সর্বত্র চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। চলতি বছরের জুন মাসের প্রথমার্ধে যখন বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছিল, তখন থেকেই তা নিয়ে জনমনে ছিল নানা কৌতূহল। জুন মাসের শেষ সপ্তাহে বাজেট পাসের আগে অনেক প্রস্তাব সংশোধন করা হয়েছে, আবার কিছু প্রস্তাব সম্পূর্ণ প্রত্যাহারও করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ পাওয়া বাজেট এখন বাস্তবায়নের পথে। নাগরিক জীবনে এই বাজেটের প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী, তা বোঝার জন্য এর প্রতিটি খাত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত এবং স্পর্শকাতর বিষয় হলো করমুক্ত আয়সীমা। প্রতিবছর বাজেট এলে সাধারণ মানুষের নজর থাকে এই আয়ের সীমার দিকে। এবার করদাতাদের জন্য এসেছে এক বিশেষ সুখবর। অর্থমন্ত্রী শুরুতে বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ থেকে বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা করার প্রস্তাব করেছিলেন। তবে জনগণের সক্ষমতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে অর্থবিল পাসের সময় এই সীমা বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে করদাতারা কিছুটা হলেও আর্থিক স্বস্তি পাবেন। গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতির চাপে সংসার খরচ যেভাবে বেড়েছে, তাতে এই করছাড় অনেকটা সহনীয় মাত্রার অক্সিজেন জোগাবে। তবে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা প্রতিটি করদাতার জানা থাকা প্রয়োজন। এখন থেকে করমুক্ত আয়সীমার পরবর্তী প্রথম এক লাখ টাকার ওপর যে পাঁচ শতাংশ কর ধার্য করা হতো, তা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে। এই স্তরের করহার তুলে নেওয়ায় করদাতাদের করের বোঝার ওপর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে একটি বিষয় মনে রাখা আবশ্যক যে, ন্যূনতম করের হার পাঁচ হাজার টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যা এই বাজেটের কাঠামোগত একটি সিদ্ধান্ত।

কর রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে এবার ব্যাপক পরিবর্তন এনে ডিজিটাল ব্যবস্থাকে আরও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে কোনো করদাতা বছরের যেকোনো সময়ে তাদের রিটার্ন জমা দিতে পারবেন, যা আগের নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতার বাইরে এক নতুন সুযোগ। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে যারা রিটার্ন দেবেন, তারা পরিশোধযোগ্য করের ওপর বিশেষ হারে করছাড়ের সুবিধা পাবেন। তবে সময় গড়ানোর সাথে সাথে এই সুবিধার হার কমে আসবে। যারা এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে রিটার্ন দেবেন, তাদের জন্য আর্থিক দণ্ডের বা পেনাল্টির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অনলাইনে রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা। পাঁচ শ্রেণির করদাতা বাদে বাকি সবাইকে এখন থেকে বাধ্যতামূলকভাবে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দিতে হবে। এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হওয়ার ফলে রিটার্ন জমার সময় আর কোনো তাড়াহুড়া থাকবে না, বরং করদাতারা ঘরে বসেই তাদের রিটার্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। অনলাইনে রিটার্ন জমার আরেকটি বড় সুবিধা হলো করছাড় এবং জরিমানার হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যাওয়া, এতে করদাতাকে আর কর অফিসের জটিলতায় পড়তে হবে না এবং হয়রানির সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে।

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর অগ্রিম কর কাটার ক্ষেত্রেও নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে। এতদিন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর যে উৎস কর কেটে রাখা হতো, তা চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু এখন থেকে বছর শেষে তা সমন্বয় করা যাবে। যদি কোনো করদাতার প্রযোজ্য করের চেয়ে বেশি টাকা কেটে নেওয়া হয়, তবে তিনি তা ফেরত পাবেন। এটি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে এই টাকা ফেরত পেতে হলে টিআইএনসহ রিটার্ন জমা দিতে হবে, যা অনেকের জন্য নতুন একটি কাজ যুক্ত করল। বর্তমানে ব্যাংক হিসাবে চার লাখ টাকা পর্যন্ত স্থিতির ওপর কোনো আবগারি শুল্ক দিতে হবে না, যা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য স্বস্তির খবর। বছরে একবার ব্যাংক হিসাবের স্থিতির ওপর এই শুল্ক ব্যাংকগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে রাখে। একই সাথে একটি ঋণ হিসাবের বিপরীতে মাত্র একবার আবগারি শুল্ক কাটবে ব্যাংক, যা ঋণগ্রহীতাদের জন্য একটি বড় স্বস্তি।

স্বাস্থ্য খাতে এবার নানামুখী ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের জন্য এই বাজেট একটি আশার আলো। ক্যানসারসহ ছয়টি দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসায় ভাতার পরিমাণ এককালীন ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। হৃদ্‌রোগীদের হার্টের রিংয়ের জোগানদার পর্যায়ে কর প্রত্যাহার করায় প্রতিটি রিংয়ে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জন্য বিশাল এক সাশ্রয়। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ভ্যাট ও অগ্রিম কর তুলে নেওয়ায় ডায়ালাইসিস বাবদ খরচ প্রতি সেশনে প্রায় আটশ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। পাশাপাশি মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ শর্তে শিক্ষাঋণ চালুর সিদ্ধান্ত মেধা বিকাশে সহায়ক হবে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগটিও অত্যন্ত প্রশংসনীয়, কারণ এই কার্ডের মাধ্যমে রোগীর পূর্ববর্তী সমস্ত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকরা জানতে পারবেন, যা জরুরি সেবার ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত বা করছাড়ের ক্ষেত্রেও এবার কিছু নতুন শর্ত যুক্ত হয়েছে, যা বড় করদাতাদের জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। আগের ১০ লাখ টাকার পরিবর্তে এবার বিনিয়োগজনিত সর্বোচ্চ কর রেয়াতের সীমা সাড়ে সাত লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি করের বোঝা বাড়িয়ে দিতে পারে। রিটার্ন জমার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ানো হয়েছে। এখন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হতেও রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বা পিএসআর দেখাতে হবে। সব মিলিয়ে ৪১ ধরনের সরকারি ও বেসরকারি সেবা পেতে রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগ, ১০ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কেনা বা হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়নের মতো অনেক জরুরি সেবার ক্ষেত্রে এখন থেকে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক। সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে ডিজিটাল সেবা ও করমুক্ত সুবিধার মাধ্যমে করদাতাদের স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে কর জাল বিস্তার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। সাধারণ নাগরিকরা এখন এই বাজেটের সুফল কতটা পাবেন, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও দক্ষতার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত