দোহায় শুরু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ কারিগরি আলোচনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬
  • ২৯ বার
দোহায় শুরু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ কারিগরি আলোচনা

প্রকাশ: ১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও উত্তেজনার মাঝে কাতারের রাজধানী দোহায় শুরু হয়েছে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বুধবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে ‘পরোক্ষ কারিগরি’ আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই আলোচনা সাধারণ কোনো দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নয়; বরং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার এবং পাকিস্তানের নিরলস প্রচেষ্টায় এই জটিল কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের দৃষ্টি এখন দোহায়, কারণ এই আলোচনার ওপর নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা এবং সাম্প্রতিক সংঘাতময় পরিস্থিতির অবসান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, উভয় পক্ষের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনার পরিকল্পনা নেই, বরং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেই তারা একে অপরের কাছে তাদের অবস্থান ও প্রস্তাবনা তুলে ধরছে।

দোহায় চলমান এই আলোচনার কাঠামোটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। অন্তত তিনটি আলাদা ওয়ার্কিং গ্রুপ বা কারিগরি দল কাজ করছে যারা মূলত পারমাণবিক কর্মসূচি, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং অর্থায়ন ও জব্দকৃত তহবিল ফেরত সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে আলোকপাত করছে। এই তিন মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে আলোচনার ভিত্তি। গত মাসে ইরান ও ওয়াশিংটন একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত প্রশমিত করা। সেই সমঝোতার পথ ধরেই আজ এই প্রযুক্তিগত পর্যায়ের বৈঠক শুরু হলো। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসন সম্ভব, কিন্তু ইরান বরাবরই সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি আলোচনায় আগ্রহী নয়; বরং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেই সকল যোগাযোগ সম্পন্ন হবে।

কারিগরি অধিবেশনগুলোর ভিত্তি স্থাপনের জন্য মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছিলেন। তবে তারা ব্যক্তিগতভাবে ইরানের প্রতিনিধিদের সাথে সরাসরি আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন না বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। অন্যদিকে, ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রত্যাশার বিপরীতে ইরান তার অবস্থানে অবিচল থেকেছে। তারা দোহায় প্রতিনিধি পাঠালেও, ওয়াশিংটনের সাথে কোনো ধরনের সরাসরি আলোচনার দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। কাতার প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, বর্তমানে কোনো উচ্চপর্যায়ের বা সরাসরি বৈঠকের পরিকল্পনা নেই। এটি সম্পূর্ণভাবে পরোক্ষ এবং কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা, যা দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের উদ্দেশ্যে সাজানো হয়েছে।

এই আলোচনাটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন উভয় দেশের মধ্যে আস্থার সংকট চরম পর্যায়ে রয়েছে। কয়েক দিন আগেই নতুন করে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছিল এবং সেই হামলার জন্য তেহরান ও ওয়াশিংটন একে অপরকে দায়ী করেছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেও দোহায় প্রতিনিধিদের উপস্থিতি শান্তি স্থাপনের প্রতি দুই দেশের এক ধরনের বাধ্যবাধকতাকে ইঙ্গিত করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের কাছে এই আলোচনার সংবাদটি এক চিলতে আশার আলো হিসেবে দেখা দিচ্ছে। মানুষ চায় যুদ্ধের দামামা থেমে যাক, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অস্থিরতা থেকে তারা মুক্তি পাক। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই পরোক্ষ কূটনীতি কতটা সফল হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েই গেছে। কারণ উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কট্টরপন্থা এবং জাতীয়তাবাদের প্রভাব প্রবল।

বিশ্লেষকদের মতে, দোহায় চলমান এই কারিগরি বৈঠকগুলো যদি পারমাণবিক কর্মসূচি বা অর্থায়নের মতো জটিল বিষয়গুলোতে কোনো কার্যকর ফর্মুলায় পৌঁছাতে পারে, তবেই আলোচনার পরবর্তী ধাপগুলো ত্বরান্বিত হবে। পাকিস্তান ও কাতারের ভূমিকা এখানে কেবল দূত হিসেবে নয়, বরং নিরাপত্তার গ্যারান্টার হিসেবেও কাজ করছে। জব্দকৃত তহবিল ফেরত পাওয়ার বিষয়টি ইরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণে আনা ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই দুই স্বার্থের লড়াইয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন মধ্যস্থতাকারীদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যখনই বড় কোনো সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়, তখন কূটনীতিই হয় একমাত্র হাতিয়ার। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুই বিপরীতমুখী শক্তির এই পরোক্ষ আলোচনা বিশ্বের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। যদিও আলোচনার শুরুর পথটা মোটেও মসৃণ নয়, তবু একটি কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানোর এটাই হয়তো শেষ সুযোগ। সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন, ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের চেয়ে কি শান্তির আলোচনার টেবিলটি বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে? দোহায় নিযুক্ত প্রতিনিধিদের কারিগরি খুঁটিনাটি নিয়ে যখন বিতর্ক চলছে, তখন বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ অপেক্ষায় আছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যখন উভয় পক্ষ চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি মুহূর্তের ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সামরিক শক্তির চেয়ে কূটনৈতিক সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের রায় নির্ধারণ করবে। দোহা এখন সেই ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার অপেক্ষায়, যেখানে হয়তো আবার নতুন করে শান্তির সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত