প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলা সামরিক অভ্যুত্থান ও পরবর্তী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে মিয়ানমারের আকাশ-বাতাস আজ লাশের গন্ধে ভারি হয়ে আছে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্ট’ বা এসিএলইডি-এর সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে যে, এই সংঘাতের বলি হয়েছে এক লাখেরও বেশি মানুষ। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সামরিক জান্তা যখন অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করে, তখন কে জানত যে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়টি শুরু হতে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের জয়গান গাওয়া এই দেশটি আজ পরিণত হয়েছে এক বিশাল মৃত্যুপুরীতে, যেখানে প্রতিটি ভোর আসে স্বজন হারানোর আর্তনাদ আর গোলাগুলির শব্দ নিয়ে।
মিয়ানমারের এই সংঘাত কেবল পরিসংখ্যানের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি হাজারো পরিবারের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের গল্প। রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা ৪৯ বছর বয়সী থেইন আয়ে নু-এর মতো কত শত মানুষ আজ দিশেহারা। গত মাসে এক বিমান হামলায় তিনি তার স্বামীকে হারিয়েছেন। তার এই আর্তনাদ যেন পুরো মিয়ানমারের প্রতিচ্ছবি। তিনি যখন বলেন যে, তিনি এখন আর জানেন না কার ওপর রাগ করবেন এবং নিয়তিকেই মেনে নিতে হচ্ছে, তখন বোঝা যায় জাতি হিসেবে তারা কতটা অসহায়ত্বের চরমে পৌঁছেছে। এই গৃহযুদ্ধ শুধু প্রাণ কাড়ছে না, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও চিরতরে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। মধ্য মাগওয়ে অঞ্চলের এক শোকার্ত পিতার কথা ভাবুন, যার সন্তান গণতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। মৃত্যুর পর সন্তানের শেষকৃত্য পর্যন্ত ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারেননি তিনি, কারণ চারদিকে তখনো চলছিল ভারী গোলাবর্ষণ। এমন অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে হাজার হাজার পরিবার তাদের প্রিয়জনদের শেষ বিদায়টুকুও জানাতে পারছে না।
সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিন অং হ্লাইংয়ের শাসনের অধীনে থাকা মিয়ানমার এখন এক গভীর রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত। সম্প্রতি এপ্রিলে অত্যন্ত সীমিত ও বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেকে বেসামরিক রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মিন অং হ্লাইং। কিন্তু এই নির্বাচনকে গণতন্ত্রকামী জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল প্রহসন হিসেবেই দেখছে। এদিকে, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো সেনাবাহিনীর শান্তি আলোচনার প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সামরিক সরকারের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের একটি মরিয়া চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। ফলে শান্তি আলোচনার সব পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে এবং সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
জাতিসংঘের মতে, মিয়ানমারে বর্তমানে ৩৭ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত। মানুষের মৌলিক অধিকার, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা আজ চরম হুমকির মুখে। দেশের প্রতিটি প্রান্ত আজ যুদ্ধের রণক্ষেত্র। ইয়াঙ্গুনের মতো শহরে গুপ্তহত্যার আতঙ্ক, আর প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিদিনের বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ—সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ অস্থিরতা বিরাজ করছে। গত বছর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পর মিয়ানমারকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক সংঘাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে এসিএলইডি। প্রায় এক হাজার ২০০টিরও বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী এই যুদ্ধে লিপ্ত, যার ফলে পরিস্থিতি বর্তমানে এতটাই জটিল যে সমাধান খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
চীনের মধ্যস্থতায় কিছু শক্তিশালী জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ায় সামরিক বাহিনী কিছুটা কৌশলগত সুবিধা পেলেও, সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো থমথমে। সৈন্যসংকট কাটাতে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা আইন কার্যকর করে জান্তা সরকার প্রায় ৫০ হাজার নাগরিককে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করেছে। এক তরুণ সেনাসদস্যের ভাষ্যমতে, নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের কোনো পূর্বপ্রস্তুতি নেই, মনে হয় তাদের সরাসরি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু মিয়ানমারের ভেতরেই নয়, এর ভয়াবহ প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্তজুড়ে। বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডে প্রতিনিয়ত বাড়ছে শরণার্থীর চাপ, যা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এই যুদ্ধের অন্ধকার জগতের আরেকটি দিক হলো মাদক ও প্রতারণা চক্র। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী হেরোইন ও মেথামফেটামিন পাচার করে যুদ্ধের অর্থ জোগাড় করছে। এছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো এখন অনলাইন প্রতারণার আখড়ায় পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে সংঘটিত এসব অপরাধ কার্যক্রম পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র কীভাবে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উচ্চাভিলাষী রাজনীতির বলি হয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে, মিয়ানমার তার এক করুণ উদাহরণ। শিশুদের স্কুলে যাওয়ার অধিকার আর তরুণদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন—সবই আজ এই গৃহযুদ্ধের আগুনে পুড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতদিন নীরব দর্শক হয়ে থাকবে এবং এই লাশের মিছিল কবে থামবে, তা এখন এক বিশাল অনিশ্চয়তার প্রশ্ন।