নেতানিয়াহুর বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এখন তারই নিয়োগ দেওয়া আইজেনকট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
নেতানিয়াহুর বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এখন তারই নিয়োগ দেওয়া আইজেনকট

প্রকাশ: ১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী এবং ঘটনাবহুল রাজনৈতিক ইতিহাসে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দাপট এক পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তা যেন এক নতুন যুগের সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিস্ময়করভাবে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এখন তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন খোদ তার নিজেরই নিয়োগ দেওয়া সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠেয় পার্লামেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে চালানো সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো চমকে দেওয়ার মতো তথ্য সামনে এনেছে। চ্যানেল-১২ এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গাদি আইজেনকটকে এগিয়ে রেখেছেন ৩৮ শতাংশ ভোটার, যেখানে নেতানিয়াহুর পক্ষে রয়েছেন ৩৬ শতাংশ। ইসরায়েলের মতো দেশে নেতানিয়াহুর মতো প্রভাবশালী নেতার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়া এবং একজন নতুন মুখের এমন উত্থান রাজনীতি সচেতনদের কাছে এক গভীর আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গাদি আইজেনকটের এই উত্থান কেবল সংখ্যার লড়াই নয়, এটি ইসরায়েলের রাজনৈতিক মেরুকরণের এক নতুন দিগন্ত। কয়েক মাস আগেও ধারণা করা হয়েছিল যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটই হবেন নেতানিয়াহুর প্রধান বাধা। কিন্তু বর্তমানে সেই জায়গা দখল করে নিয়েছেন আইজেনকটের দল ‘ইয়াশার’। এক বছরেরও কম সময় আগে গঠিত এই দলটি অভাবনীয় দ্রুততায় জনমতের শীর্ষে উঠে আসছে। জরিপের তথ্যমতে, বর্তমান পার্লামেন্ট বা নেসেটে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেতে পারে ২৩টি আসন, আর গাদি আইজেনকটের ইয়াশার দলের সম্ভাব্য আসন সংখ্যা ২১। এর পাশাপাশি বেনেট-লাপিদ জোট ১৮টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিসংখ্যানের এই ব্যবধান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, নেতানিয়াহু এবার ক্যারিয়ারের অন্যতম কঠিন নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।

ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে আইজেনকটের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার পেছনে রয়েছে তার বর্ণাঢ্য সামরিক ক্যারিয়ার এবং গাজা যুদ্ধে ব্যক্তিগত শোকের প্রেক্ষাপট। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আইজেনকটকে একসময় নেতানিয়াহু নিজেই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তিনি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছিলেন। তবে যুদ্ধের কৌশল এবং বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে তার একটি বলিষ্ঠ ও স্বাধীন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি বাড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে বেশি মানবিক বেদনার জায়গা হলো, গাজা যুদ্ধে তিনি তার নিজের সন্তান ও দুই ভাতিজাকে হারিয়েছেন। স্বজন হারানোর এই তীব্র বেদনা তার প্রতি সাধারণ ইসরায়েলি নাগরিকদের সহানুভূতি ও সমর্থনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

আইজেনকটের জনপ্রিয়তা দেখে নেতানিয়াহুর শিবির কিছুটা উদ্বিগ্ন। তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় এর আঁচ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি লিকুদ পার্টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে, আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া গাদি আইজেনকট সরকার গঠন করতে পারবেন না। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে নেতানিয়াহুর দলের এই ‘অ্যান্টি-আরব’ বা আরব-বিরোধী ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে, তারা ভোটারদের ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী আবেগকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া। যদিও এই পুরনো কৌশল বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, এবার জনমত জরিপ বলছে, ভোটাররা পরিবর্তন ও নতুন নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

তবে আইজেনকটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সরকার গঠন করা। ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত বিভক্ত এবং এখানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া যেকোনো দলের জন্যই কঠিন। বিভিন্ন মতাদর্শের ছোট ছোট দলগুলোকে নিয়ে একটি স্থিতিশীল জোট সরকার গঠন করা আইজেনকটের জন্য এক বিশাল পরীক্ষার বিষয় হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইজেনকটের জনপ্রিয়তা এখন আকাশচুম্বী হলেও, ভোটের সমীকরণ মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে তাকে অনেক কৌশলী হতে হবে। ইসরায়েলি রাজনীতিতে সবসময়ই জোট সরকার গঠনের ক্ষেত্রে চরম নাটকীয়তা দেখা যায়, আর এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

নেতানিয়াহুর শাসনকাল ইসরায়েলের ইতিহাসের এক দীর্ঘতম সময়। তার রাজনৈতিক কৌশল ও ক্ষমতার লড়াইয়ে টিকে থাকার ক্ষমতা বিশ্বজুড়ে আলোচিত। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। আইজেনকটের মতো একজন সামরিক ব্যাকগ্রাউন্ডের ব্যক্তি, যিনি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোকে ভেতর থেকে চেনেন এবং যার ওপর যুদ্ধ ও শান্তির উভয় অভিজ্ঞতাই রয়েছে, তিনি এখন নেতানিয়াহুর জন্য মূর্তিমান আতঙ্কের কারণ। ভোটাররা কি পুরনো অভিজ্ঞ নেতানিয়াহুকে বেছে নেবেন, নাকি পরিবর্তনের আশায় আইজেনকটের নতুন পথের সঙ্গী হবেন—সেটিই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।

ইসরায়েলের পরবর্তী নির্বাচনী লড়াই কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, এটি দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শনের এক বড় পরীক্ষা। অক্টোবর মাসের নির্বাচন কেবল নেসেটের আসন নির্ধারণ করবে না, বরং দেশটি আগামীতে কোন পথে হাঁটবে, তার দিকনির্দেশনাও ঠিক করে দেবে। একদিকে নেতানিয়াহুর গতানুগতিক কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্ব, আর অন্যদিকে আইজেনকটের নতুন নেতৃত্ব ও পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি—এই দুইয়ের মধ্যে ইসরায়েলের সাধারণ মানুষ কাকে বেছে নেন, তা দেখতে এখন পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে। পরিবর্তনের এই হাওয়া কি শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটাবে, নাকি তিনি তার পুরনো কৌশলে ফের জয়ী হবেন, তা নিশ্চিত হতে আমাদের অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত