প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে রাজধানী ঢাকার রায়েরবাজার কবরস্থানে এক শোকাবহ অথচ বিপ্লবী পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এক আবেগঘন কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন এক তিক্ত সত্য—জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও, যে বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন আপামর ছাত্র-জনতা, সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যেই এনসিপির শীর্ষ নেতাদের নিয়ে তিনি শহীদদের গণকবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ আন্দোলনে প্রাণ হারানো এক হাজার চারশ শহীদ ও ত্রিশ হাজার আহত যোদ্ধার আত্মত্যাগের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
এই স্মরণসভাটি কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি রাজনৈতিক বার্তা। নাহিদ ইসলামের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল সেই লক্ষ লক্ষ ছাত্র-শিক্ষক, শ্রমিক, নারী, পেশাজীবী ও প্রবাসীদের সম্মিলিত আকুতি, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন স্বৈরাচার পতনের ডাক দিয়ে। তিনি সেই সকল সেনা কর্মকর্তা ও তরুণ সদস্যদের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন, যারা পর্দার আড়ালে থেকে গণ-অভ্যুত্থানকে সফল করতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। তাদের প্রত্যেকের অবদানকে স্বীকার করে নিয়ে নাহিদ ইসলাম পুনর্ব্যক্ত করেন যে, জুলাইয়ের এই জয় কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নয়, বরং এটি সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের অর্জিত এক বিশাল অর্জন। কিন্তু সেই অর্জনের সুফল এখনো সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছানোয় তিনি তার হতাশা ও ক্ষোভ গোপন করেননি।
ইনু ও জাসদের নেতাদের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত রায়ের বিষয়ে তিনি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। হাসানুল হক ইনুকে মাত্র দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার রায়কে তিনি জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, জুলাই গণহত্যার নেপথ্যে শেখ হাসিনার প্রধান সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী হিসেবে ইনু ও তার সহযোগীদের যে ভূমিকা ছিল, তাতে এই সাজার মাত্রা অত্যন্ত লঘু। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধারা এই রায়ে ন্যায়বিচার পাননি। রাষ্ট্রের উচিত অবিলম্বে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা এবং গণহত্যার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এছাড়া ভারত থেকে শেখ হাসিনাসহ পলাতক অপরাধীদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা বর্তমান সরকারের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা বলে তিনি মনে করেন।
জুলাই হত্যা মামলার বিচারে বর্তমান সরকারের ধীরগতির সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন যে, গত কয়েক বছরে মাত্র দুটি মামলার রায় হয়েছে, যা কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয়। শহীদ পরিবারের সাথে করা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা ও যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের বিষয়গুলো কেন এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, সেই প্রশ্নও তিনি উত্থাপন করেন। রায়ের প্রতীক্ষায় থাকা স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতা যে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে হতাশা তৈরি করছে, তা তিনি সরকারি নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরেন। সংস্কারের প্রশ্নে নাহিদ ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট—নির্বাচন ও গণভোটের ম্যান্ডেট অনুযায়ী রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জিত হবে না। তিনি মনে করেন, নামকাওয়াস্তে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পালন করা নয়, বরং সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সরকারকে প্রমাণ করতে হবে তারা জুলাইয়ের চেতনার সাথে আছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর নিয়ে তার মন্তব্য ছিল বেশ কড়া ও সতর্কতামূলক। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, ৫ আগস্টের মধ্যে যদি জাদুঘরটি খুলে দেওয়া না হয়, তবে জনগণই তা নিজ দায়িত্বে উন্মুক্ত করে দেবে। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়জুড়ে জুলাই কেন্দ্রিক যে ৩৬ দিনের কর্মসূচি পালিত হয়েছিল, বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে তার অভাব তাকে বেশ ব্যথিত করেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে জুলাইয়ের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য সরকারি ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় ধরনের কর্মসূচির ঘোষণা দেবে। জাদুঘর বা স্মৃতিস্তম্ভ কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, বরং এগুলো হলো ইতিহাসের দলিল, যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে জুলাইয়ের আত্মত্যাগের গল্প পৌঁছে দেবে।
কবরস্থান সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি শহীদ পরিবার যেন তাদের স্বজনদের কবরের কাছে গিয়ে অন্তত মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, সেটির ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু এখন পর্যন্ত কবরস্থান সংরক্ষণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় তিনি গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেন। এবারের জুলাই জাগরণের কর্মসূচির শিরোনাম ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’—এটিই এখন এনসিপির মূলমন্ত্র। মাসব্যাপী এই কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, পদযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, যা ৫ আগস্ট ‘বিজয়ের উল্লাস’ আয়োজনের মাধ্যমে শেষ হবে। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের শক্তি যে কেবল রাজপথের উত্তাপ নয়, বরং দেশ গড়ার গঠনমূলক শক্তিও—তা এনসিপি তাদের এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রমাণ করতে চায়।
পরিশেষে, নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য যেন বাংলাদেশের আপামর জনতার দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যে স্বপ্ন নিয়ে মানুষ গুলি খাওয়ার ভয় উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছিল, সেই স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলনের রেশ যে থেমে যাবে না, তা আজ স্পষ্ট। রাষ্ট্র যখন সংস্কারের ধীরগতিতে আটকে থাকে, তখন শহীদ পরিবারের স্বজনরা বা আহত যোদ্ধারা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলবেন—তবে কেন জীবন দিয়েছিলেন তারা? সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এসেছে। সরকার ও জনগণের মধ্যেকার এই বিশ্বাসের সেতু বন্ধন টিকিয়ে রাখতে হলে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও সংস্কারের এজেন্ডাকেই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায়, জুলাইয়ের শহীদদের ত্যাগের ইতিহাস ধূসর হয়ে যেতে পারে, যা কখনোই কাম্য নয়। ইতিহাসের এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে, জুলাইয়ের চেতনা কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার।